Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

| |

ব্রেকিং নিউজঃ

পুরাণে বেঁধেছি নতুন প্রাণ || রেবেকা সুলতানা

আপডেটঃ 10:03 am | March 31, 2019

নয় ভাইবোনের সংসারে বেড়ে উঠা এই আমিটা কত না রঙিন স্বপ্ন দেখতাম। আত্মকেন্দ্রিকতায় ভরা স্বপ্নগুলোর মধ্যে ছিল- কখনও আমি ডাক্তার হতে চাইতাম। সাদা এপ্রোনে বেশ মানানসই লাগবে আমাকে ভেবে কি যে পুলকিত হতাম! আবার কখনো সিনেমার গল্পে দেখে তাদের মতোই ব্যারিস্টার হতে চাইতাম। কালো কোট আর কালো গাউন পরা ব্যারিস্টার আমি হবোই হবো। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত নম্বর কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের বারান্দায় হাটতে দিলোনা। তাতে কি স্বপ্ন দেখাই ছেড়ে দিবো? আবার অন্য ইচ্ছা ভর করলো। এইবার আমি হয় এডমিনিস্ট্রেটর নয় শিক্ষক হয়েই ছাড়বো।

অবশেষে ক্যারিয়ার গড়ার মাঝপথে নিজের জীবন বেধে নিলাম অন্য জীবনের সাথে পরিবারের সাধে। বাহ! এতো অন্য জগত! স্বপ্ন আবার বাক নিলো অন্য রাস্তায়। নতুন জীবন একদিকে অন্যদিকে ভাই বোন সব নিয়ে রকমারি সংসারে অভ্যস্ততা, আর রকমারি স্বপ্ন। সময় পার করে ফুটফুটে তিন সন্তানের মা হলাম একে একে। প্রতি দিন বাচ্চাদের গোসল শেষে ছেলেদের ছবি উঠাতাম। কতোখানি বড় হলো বা কি পার্থক্য হলো দেখতাম অহর্ণিশ। একমাস পর পর স্টুডিওতে গিয়ে তাদের ছবি তুলতাম মাসিক পরিবর্তন লক্ষ্য করতে। এভাবে কাটলো কয়েক বছর। ১৬ মাসের ব্যবধানের দুই ছেলে তরতর করে বাড়তে থাকলো। দেখলাম ছোট ছেলেটার হাতেই থাকে বড় ছেলেটা। আমার মাথায় মিশ্র অনুভুতি খেলা করে। মনে বেজে উঠে ঠাকুরমার ঝুলির গান। “কি হয় কি হয়, কখনো মজার কখনও বা ভয়।” পাচ বছর পর যুক্ত হলো আরো একজন। আমি আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। তখন আমার এক এক করে তিন সন্তান, চোখের সামনে ওদের রোজ বেড়ে উঠা আর ছোট ছোট হাত পা বড় হওয়ার যে নির্মল আনন্দ তার মাঝেই আমার স্বপ্নের বীজ নতুনভাবে প্রোথিত হতে শুরু করলো।

মাতৃত্বকে আকড়ে ধরে সন্তানদের বড় করাও যে মানুষের স্বপ্ন হতে পারে বা জীবনের একমাত্র অবলম্বন হতে পারে তা তখন থেকে অনুধাবন করলাম। সেসব স্বপ্নের নানান রঙ, নানান সাজে সজ্জিত সেসব সোনালী অতীত। তখন বয়স তো খুব বেশি নয়, স্বপ্ন আর বাস্তবের পার্থক্য কতো কঠিন হয় তা কি আর মাথায় আসতো! সেই ফারাকের জায়গাটা না হয় নাই আসুক আমার এই এলোমেলো আত্মকথনে। বিলাসী স্বপ্নের বুকে ভেসে ভেসে জীবনে মূল্যবান সময়কে কতো নিমিষে আমরা মূল্যহীন করে দিয়ে সারাজীবন হাসপাস করে বেড়াই সেসব হিসেব গল্প করা নিতান্তই অমুলক। স্বপ্ন হারানো, স্বপ্ন বদলে যাওয়া, স্বপ্নের পট বদল কিংবা জিতে জিতে হেরে যাওয়া এর পেছনে অনেক কারন থাকে, অনেকের দায়িত্বহীনতা থাকে। আমি তবু নিজেকেই দায়ী করি বারবার! খেই হারানো খামখেয়ালী জীবনের দায় নিতান্তই আমার! যাহোক আমার স্বপ্নের বীজ যেহেতু রচিত হলো আমার ছেলেদের সাথে গল্পটা তাই ছেলেদের ঘিরেই হোক।

বড় ছেলেটা একটি উদ্যোক্তামুখী সংগঠন স্বপ্নলোক এর কনিষ্ঠতম সদস্য। স্বপ্নলোক- কতিপয় তরুনের স্বপ্ন ধারনের, স্বপ্ন লালনের একটি সংগঠন। সত্যি বলতে শিহরিত হবার মত একটি নাম স্বপ্নলোক আর তাই আমার স্বপ্নগুলোও আবার পুরোনো খুচরা খাতার পৃষ্ঠা উলটে দেখে নিলাম। ২০ জন তরুন আছে সংগঠনটি ঘিরে। তাদের দেখা নানা স্বপ্ন পূরনের অংগীকার নিয়ে এই সমবায়ী প্লাটফর্মে যুক্ত হয়েছে ছেলেগুলো।একদিন আমার কাছে এসে বলছে আপু, আমরা উনিশ আপনাকে চাই কিন্তু উনিশটা ভাই এর একটা বোন যদি আপত্তি না থাকে। আমি বলে দিলাম বোন আছে কিন্তু স্বপ্ন দেখার এ গল্পে আমি আমার বড় ছেলেটার নাম লিখে দিলাম। সেই থেকে উনিশের আদরে আমার বড় ছেলে তাজওয়ার ওদের কনিষ্ঠতম সদস্য। ওদের সংগঠনটির পুরো নাম স্বপ্নলোক উদ্যোক্তা সমাজ। তারা সমাজ বদল তথা সিস্টেম বদলের শপথ নিয়েছে। এখন তারা নিজেদের শানিত করছে একদিন তারা নানান উদ্যোগে উজ্জীবিত করবে বাংলাদেশ। স্বপ্ন দেখতে সাহস লাগে আর তাই সাহসী এই স্বপ্নবোদ্ধা বাচ্চাগুলোকে আমার প্রণতি, আমার স্যালুট! আমার বিশ্বাস এই বিশ জন বাংলাদেশে বিদ্যমান ২০ টা সমস্যার মুলোৎপাটন করে সমাধানে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারবে আর তাহলেই স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণ হবে।

স্বপ্নলোক সম্প্রতি একটা বনভোজনের আয়োজন করে। তাদের একমাত্র কনিষ্ঠ সদস্য তখন এস এস সি দিতে বসেছে তাই তার প্রতিনিধি হিসেবে বনভোজন দলে সঙ্গী হলো তার দুই ছোট ভাই শাফিন ও জাহিন। তখন থেকেই ওদের জন্য একটা কথাগুলো মাথায় ঘুরছিল, ব্যস্ততায় ও আলস্যে ঘেরা সময়ে তাই কথাগুলো লেখা হয়ে উঠতে সময় নিয়েছে বেশ। তাদের গন্তব্য ছিল লাউচাপড়া-কর্ণঝড়া, জামালপুর । সকাল ৭ টায় শম্ভুগঞ্জ ব্রিজ থেকে যাত্রা শুরু হয় মুল স্পটের উদ্দেশ্যে। পুর্ণ গতি নিয়ে চড়ুইভাতির গাড়ি চড়ুইপাখিদের নিয়ে গন্তব্যের দিকে ছুটে চলে। ততোক্ষনে আমার মন চলে গেছে আমার বর্ণিল কৈশোরে। শাসনে সোহাগে বেড়ে উঠা কৈশোর! সেখানে চড়ুভাতি হতো খুব আনন্দময়। পাড়ার ছেলেমেয়েরা মিলে সবার ঘর থেকে মুঠো ভরে চাল, দু-একটা ডিম, কারও ঘরের ডাল, পাশের পুকুর থেকে মাছ আর বড়রা কেউ কেউ দায়িত্ব নিয়ে মুরগী আর মসলা জোগাড় হতো! আহা! কি নিদারুন অনুভুতি সেই চড়ুইভাতির! সকাল থেকে আনন্দ। খুব দ্রুত কাজ সেড়ে খাবারের জন্য অপেক্ষা। উঠানে বসে খাওয়া হতো। ওইরকম স্বাদের খাবার খাওয়া হয়নি বহুদিন। আসলে তখন খাবারের সাথে ভালোবাসা মেখে চেটেপুটে খেতাম, আর আজ রকমারি আয়োজনের খাবার হয় কিন্তু সেই আবেগ, ভালোবাসার বেনুনে মাখানো হয়না খাবার আর! এইতো গত কয়েকমাস আগেই কোন এক সকালে বন্ধু রোকন কে বললাম, অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালীন গাজীপুর বনে বসে যে খাবার খেলাম ঠিক একই স্বাদযুক্ত খাবারের আয়োজন করলে আমি আবার গাজীপুরে যাবো বেড়াতে। কি স্বাদের খাবার ছিল! আহা!

স্বপ্নলোকের আয়োজনেও ছিল রকমারি খাবার। নিশ্চয়ই ওদের আয়োজনের আবেগ আর ভালোবাসার মসলা যুক্ত হয়েছিল তাই নিশ্চয়ই খুব মজাদার খাবার হয়েছিল ওদের। তাদের জন্য আছে ১৮ পদের খাবার। এর মধ্যে বিভিন্ন রকমের ভর্তা, ভাজি, ডাল, চাটনী উল্লেখযোগ্য। ব্যাতিক্রম হলো এই খাবারগুলো এসেছে সদস্যদের পরিবার থেকে। সর্বোচ্চ আবেগ দিয়ে আর পরম মমতা, আগ্রহ নিয়ে রান্না করেছেন এরকম সোনার ছেলেদের জন্ম দেয়া গর্বিত মায়েরা। ফেরার পর ওদের মুখে শুনেছি কতো খাবার বাড়তি হয়েছিল সেদিন, একেক মায়ের এক পদের খাবার দিয়েই নাকি সেড়ে নেওয়া যেতো সেদিনের চড়ুইভাতি! আমি হাসলাম আর আমার নস্টালজিক মন তোমাদের দেখে নতুন করে স্বপ্ন বুনতে শুরু করে- এখানে তোমাদের স্বপ্নবাজি সফলতা | এগিয়ে যাও স্বপ্নলোক উদ্যোক্তা সমাজ | শুভ কামনা নিরন্তর ||

লেখক : রেবেকা সুলতানা, উপদেষ্টা, স্বপ্বলোক উদ্যোক্তা সমাজ ও নির্বাহী পরিচালক, অন্যচিত্র উন্নয়ন সংস্থা |

Print Friendly, PDF & Email