Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

| |

ব্রেকিং নিউজঃ

মাতৃকাহন || রেবেকা সুলতানা

আপডেটঃ 9:13 pm | May 12, 2019

আমি আর আমার মা, আমাদের কাহন শোনার সাথী আমরাই। অনেক গভীরভাবে আমার মা কে নিয়ে ভেবে কিছু একটা লিখবো ভাবি। কিন্তু এ মানুষটির এতো এতো কাহন যে আমি তাদের আর গাথুনি দিতে পারিনা। সন্তান হিসেবে এ আমার আজন্ম ব্যর্থতা।

আমি আমার মায়ের বড় মেয়ে। সংসারের কাজে সবচেয়ে বড় সাথী আমিই ছিলাম। অনুজ সব কয়টা ভাই বোন তো আমার কোলেই ঝুলেছিল মায়ের পরে।

তেরোটি সন্তানের জননী আমার রত্নগর্ভা উপাধি পাওয়া মা। যদিও পৃথিবীর আলোতে বেড়ে উঠেছি আমরা নয়জন। আমি অবাক হই কিভাবে সম্ভব একটি মানুষ তার বাড়ির কাজ সামলে, সংসারের সভ দায়িত্ব সামলে, অভাব অনটন ঘুচিয়ে এই নিয়জনের ক্যাচর ম্যাচর সহ্য করা?

নয় সন্তানের এই জননী খুবই সিদ্ধহস্ত ছিলেন সন্তান মানুষ করার ক্ষেত্রে। ব্যক্তিজীবনে আমি হয়তো ততোটা সফল নই কিন্তু যতোদিন মায়ের আচলে ছিলাম কড়া শাসনেই রেখেছেন তিনি। শাসনে কোন ছাড় ছিলোনা আমার মায়ের। মার দেয়ার ব্যাপারে আমার রাগী বাপের থেকেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন আমার মা। আমার মায়ের মুখে একটাই কথা ছিল- পড়ো! উঠতে হবে! পড়ে থাকা যাবেনা তাই পড়াশোনাই লক্ষ্য হোক। অভাব অনটন দুহাতে সামলে ওনি আমাদের প্রেষনা দিয়েছেন ঘুরে দাড়াবার জন্য।নয় ভাই বোন এর প্রায় সবাই দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা স্নাতক, স্নাতকোত্তর করতে পেরেছিলাম তারই জন্য। কর্মজীবনে আমি ছাড়া কম বেশি সবাই ভাল অবস্থানেই আছে বলা যায়। আর যারা এখনো দাঁড়ায়নি তারা শুরু করবে বলে প্রহর গুনছে। এতোগুলো ভাই বোনকে নিয়ন্ত্রনে রেখে দাড় করানোর যে নিয়ত প্রচেষ্টা তা তো আমার মায়ের ই ছিলো, বাবা হয়তো যোগান দিয়েছেন যতোটা পেরেছেন। কিন্তু যুদ্ধতো আমার মায়ের হাতেই ছিলো তাইনা? আর তাই আমার মা পেয়েছেন রত্মগর্ভা উপাধি। রত্নগর্ভা তিনি নিজের যোগ্যতায় হয়েছেন বলতেই হয়!

আমার মা আমার কাছে আইডল। সারাদিন অনেক মায়ের গল্প পড়েছি। ভাবছিলাম অহেতুল এসব লিখে কি হবে? হঠাৎ মন নড়ে গেল-
এটা তো নিছক লেখা নয়। যতোক্ষন লিখবো ততোক্ষন মাকে ভাবা হবে। সে হিসেবে মা দিবস উপলক্ষটা মন্দ নয়। এভাবেই কিছুটা মা কাহন শুরু হলো আমার দেয়ালে।

আমার মা- মাইর দেয়ায় যেমন পটু ছিলেন আদর করাতেও ছিলেন অসীম হৃদয়ের মালিক। এখন তো আমিও মা। কখনো কখনো আমার তিন ছেলের গায়ে আমিও দু চার হাত চর থাপ্পর দিয়েই দেই। আমার ছেলেরা বলে আম্মু, তুমি আমাদের মারো কেন? বাচ্চাদের মারতে নেই। আমার বন্ধুদের তাদের মায়েরা মার দেয়না। আমি বলি – তোমাদের নানু আমাদের ভাতের পাতিল দিয়েও মারতেন। মাইর দেয়া হয় একই ভুল বারবার যেন না হয় সেটা বুঝিয়ে দিতে। ভাল মানুষ বানাতে এটা দরকার হয় বৈ কি! সুতরাং এটাও ভালোবাসা। তোমাদের নানু এভাবে মারতেন বলেই ওনি রত্নগর্ভা পরিচয় পেয়েছেন। আমিও তাই হতে চাই!!

কিন্তু আমি মলিন হই মাঝে মাঝেই। একা হাতে পুরো পরিবার সামলে আমার মা আমাদের বড় করেছেন। অহংকার করার মতো গৌরব কুড়োতে না পারলেও সমাজে দাড়াবার উপযোগী করেছেন সন্তানদের। কিভাবে পারলেন এই মানুষটি? তিন সন্তানের খেলা আর সংসারের ঠ্যালা সামলাতে গিয়ে কখনো যে খুব ক্লান্তি বাসা বাধে, মনে হয় থেমে যাক এই জীবনচক্র। আবারও আমার মা কে ভাবি আর গতিধারণ করি, সন্তানদের গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগুতেই থাকি আগামীর দিকে। আমি জানিনা আমার মা কে আমার বাবা কতোখানি মানসিক শক্তি দিয়েছেন কিন্তু এ যুদ্ধে জয়ী হতে নিশ্চয়ই আমার পিতার অবদান ও কম নয়। আমিও আমার মায়ের মতোই জিততে চাই। কোন অভাবে কিংবা আমার ভেঙে যাওয়ার স্বভাবে আমি হারতে চাইনা। আমিও আমার সন্তানদের উপযুক্ত মা হয়ে উঠতে চাই অবিরাম।

আমার অন্যচিত্র অফিসে আমার মা কে নিয়ে গেলাম এক শুক্রবারে। আম্মা- এ অফিস টা বানিয়েছি মানুষের জন্য কাজ করতে চাই বলে।আম্মা বলে – আমি এতো কিছু বুঝিনা। যা খুশি কর। কিন্তু মন দিয়া কর। পরিশ্রম করলে সব কাজেই সফলতা আসে। এ বয়সেও আমার মায়ের সাহস আমাকে আন্দোলিত করেছে। আজ এই স্ট্যাটাসে জানিয়ে দিচ্ছি মা –

আমার স্বপ্নে আমি অবিচল থাকবো
সফলতা আনতে পরিশ্রমে আপসহীন হবো
সন্তানদের মানুষ করতে কঠোরতার মাঝেও মমতা রাখবো, মমতার মাঝেও কঠোরতা রাখবো।
তুমি দেখে নিও মা-
তোমার বাসন মাজার সাথী, রান্না ঘরের সাথী, ছোট ছোট গল্পকথার সাথী তোমার এই ব্যর্থ মেয়েটাও আগামীটা সুন্দর করে তুলবে।

আমার প্রিয় জননী তুমি বেচে থাকো অনন্তকাল। তোমার জন্য আমার ভালোবাসা অবিরাম। তোমার পায়ে লুটিয়ে পড়ুক আমার সকল সফলতার গল্প এই হোক আমার প্রত্যয়। তোমার সন্তানদের মতো আমার ছেলেরাও আমাকে আলোর দিকে টেনে তুলুক এটাই আমি চাই।

জগতের সকল মায়েরা ভালো থাকুক। আমার মায়ের মতো সকল মায়ের জীবনের গল্পগুলোই প্রায় এক, ছাচটা শুধু আলাদা হয় মাত্র। আগামীর পৃথিবী মায়েদের হোক। বৃদ্ধাশ্রমে না হোক কোন মায়ের ঠিকানা।

লেখক: রেবেকা সুলতানা, নির্বাহী পরিচালক, অন্যচিত্র উন্নয়ন সংস্থা৷
ময়মনসিংহ৷

Print Friendly, PDF & Email