Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

| |

গৌরীপুর আর.কে. সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের আজ ১০৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ॥ আজও জমি সংক্রান্ত সৃষ্ট বিরোধ নিষ্পত্তি হয়নি ॥ শ্রেণি কক্ষ সংকট ॥ ছাত্রী ভর্তি বন্ধ

আপডেটঃ 11:16 pm | July 10, 2019

প্রধান প্রতিবেদক, গৌরীপুর অঞ্চল :
ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ গৌরীপুর আর.কে (রাজেন্দ্র কিশোর) সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী আজ (বুধবার, ১০জুলাই/২০১৯)। কোনরূপ নোটিশ ছাড়াই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ছাত্রী ভর্তি। সর্বশেষ ব্যাচের ছাত্রীরা এ বছরই এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ২৮বছরেও সরকারিকরণে শিক্ষকের ২৫পদ সংখ্যায় উন্নীত করা হয়নি। প্রধান শিক্ষকের পদটিও দেড় বছর যাবত শূণ্য। শ্রেণিকক্ষ সংকটে বিঘিœত হচ্ছে পাঠদান। ঐতিহ্যবাহী ভবনের ছাদ চুষে পানি পড়ে। প্রধান শিক্ষকের বাসভবন ও ছাত্র হোস্টেল বসবাস অযোগ্য। জনমানুষের দাবি ছাত্রী ভর্তি পূন:রায় চালুকরণ করে দুই শিফট চালু করা।
জানা যায়, বিদ্যালয়টিতে বর্তমান ছাত্র সংখ্যা ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ১০ শ্রেণি পর্যন্ত ৬৮২জন। বিদ্যালয়টিতে ২০১২ ও ২০১৩ শিক্ষাবর্ষে ছাত্রী ভর্তি শুরু হয়। তবে ২০১৪সাল থেকে অজ্ঞাত কারণে আবারও ছাত্রী ভর্তি বন্ধ রয়েছে। গৌরীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান ফকির বলেন, সরকারি বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার প্রসার ঘটাতে ছাত্রী ভর্তিসহ দুই শিফট চালুর দাবি জানাচ্ছি। উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান রাবেয়া ইসলাম ডলি বলেন, মেধা লালনের অন্যতম বিদ্যাপীঠে আমার মেয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। মেধাবী ছাত্রীদের এ বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ দেয়া এখন সময়ের দাবি।
এ দিকে ১৯৯১সালে সরকারিকরণে শিক্ষকের পদসংখ্যা ২৫জনের স্থলে ১৭জন লিপিবদ্ধ হয়। ২৮বছরেও এ ভুলের হয়নি সংশোধন! ফলে ৮জন শিক্ষকের পদসংখ্যা কম নিয়ে চলছে এ বিদ্যাপীঠ। ৬জন এমএলএসএসের স্থলে আছেন ১জন, নেই নৈশ্য প্রহরী। এ বিদ্যালয়ের প্রেষণে থাকা উচ্চমান সহকারীর প্রেষণ বাতিল করে জন্মদিনের উপহার দিবে বলে এ প্রতিনিধিকে নিশ্চিত করেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ড ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপ-পরিচালক আবু নূর মো. আনিসুল ইসলাম চৌধুরী। জীব বিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থ বিজ্ঞান, ইসলাম শিক্ষা ও হিন্দু ধর্মের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। ২০১৮সালের ১৮এপ্রিল থেকে বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূণ্য রয়েছে। ছাত্র অনুপাতে শ্রেণি কক্ষের প্রয়োজন ১৮টি। আছে মাত্র ১০টি। ফলে সুষ্ঠুভাবে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শিক্ষক মোছা: লুৎফা খাতুন বলেন, ৬তলা বিশিষ্ট নতুন ভবনের কাজ শুরু হওয়ার কথা। সেটা হলে শ্রেণিকক্ষের সমস্যা থাকবে না। ৮জন শিক্ষকের পদসৃষ্টির জন্য উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করা হয়েছে।
অপরদিকে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায় ২০জন ও পাসের হারে প্রথমস্থান অর্জন করেছে। জাতীয় পর্যায়ে ২০১৮সালে স্কাউট প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে ১০ম শ্রেণির ছাত্র আজমাইন নূর সাজিম। অপরদিকে ২০১৭সালে স্কাউট প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলো এস.এম নাজমুল হক ও মেহেদী হাসান সোহান। অপরদিকে ২০১৬সালে মোহাম্মদ আমির হামযা ও মোঃ পিয়াস আহাম্মেদও স্কাউট পদক অর্জন করেন। এ বছর জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ ২০১৯ উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শ্রেষ্ঠ স্কাউট গ্রুপ ও শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান হন মোছা. লুৎফা খাতুন এবং শ্রেষ্ঠ শ্রেণি শিক্ষক নির্বাচিত হন সহকারী শিক্ষক মো. জাহিদুল আলম। শ্রেষ্ঠ ছাত্র নির্বাচিত হন তৌসিফ হাসিন ও শ্রেষ্ঠ স্কাউট মো. জাহাঙ্গীর আলম।
এ দিকে জানা যায়, তৎকালীন জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী তাঁর পিতা রাজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর নামে ১৯১১সনের এইদিনে ৬হাজার ১৮বর্গফুট আয়তনে এ বিদ্যালয়টি স্থাপন করেন। বিদ্যালয়টির নামে প্রায় ১১একর জমি নিষ্কর ও ক্ষতিপূরণ অযোগ্য ঘোষণায় একটি দলিল সম্পাদন করে দেন। ভূমি জরীপকারীদের ভুলের কারণে বিদ্যালয়ের দাপুনিয়া মৌজার খেলার মাঠসহ কিছু জমি ১নং খাস খতিয়ানে লিপিবদ্ধ হয়। এনিয়ে নেয় বেড়েছে জটিলতা। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৯৯৯সালে ভূমি আইনে মামলা করে বিদ্যালয়ের পক্ষে রায় পায়। এছাড়াও ১৫শতাংশ ভূমির লীজ বাতিল করতে আন্দোলনে নামতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। সৃষ্ট জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় খাজনা নেয়নি পৌর ভূমি অফিস।
আরো জানা যায়, ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন, ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯’র গণঅভ্যূত্থান, ১৯৭১’র মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের রয়েছে গৌররোজ্জ্বল অবদান। মেধাবী শিক্ষার্থীরাও ছড়িয়ে আছেন এবং ছিলেন উপমহাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। চোখ জোড়ানো নয়নাভিরাম সুনিপূর্ণ কারুকার্যে নির্মিত শতবর্ষী ইংরেজী ই অক্ষরের ভবনটি অনন্যাস্থাপত্য শৈলী। বিখ্যাত আর্কিটেক ও চীনা কারিগর দিয়ে নির্মিত এ ভবনটি দেখতে অনেকটা ইংরেজী (ই) অক্ষরের মতো। কাঠের ফ্রেমের উপর ইট, চুন-সুরকীর মিশ্রণে ১৫ইঞ্চির গাঁথানি দিয়ে নির্মিত লাল রং করা বিদ্যালয়টিতে সর্বমোট ১৩টি কক্ষ রয়েছে। সংস্কার ও মেরামতের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ৬টি কক্ষ ইতোমধ্যে ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা অবৈতনিক প্রধান শিক্ষক ছিলেন বাবু জ্ঞানেন্দ্র নাথ মূখার্জি।
১৯১৯সনে সর্বভারতীয় সরকারি বৃত্তিপ্রাপ্ত কৃতি ছাত্র মোঃ আকবর আলী তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের প্রাদেশিক আইন পরিষদের পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী ছিলেন। প্রাদেশিক সরকারের অর্থ মন্ত্রী ফখরউদ্দিন আহমেদ, তৎকালীন প্রাদেশিক সরকারের কৃষি মন্ত্রী পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বস্ত্র মন্ত্রী হাসিম উদ্দিন আহমেদ, প্রাদেশিক পরিষদের এম.পি.এ আব্দুল হামিদ, সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ. এফ. এম. আহসান উদ্দিন চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মোঃ হাতেম আলী এম.সি.এ, বিশিষ্ট নাট্যকার ও সাহিত্যিক আশকার ইবনে শাইখ অত্র বিদ্যালয়ে জ্ঞানর্জন করেন। নেত্রকোনা থেকে ইংরেজ হঠাও আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা মুখ্যলাল দাসও এবিদ্যালয়ের ছাত্র। সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ এমপি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের শিক্ষা বিভাগের বাংলাদেশ প্রধান সুব্রত শংকর ধর, বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ এ.কে.এম.এ.মুক্তাদির, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও প্রজেক্ট ডিরেক্টর ডা: মো: শাহাবুদ্দিন, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাহ আলমগীর, বাংলাদেশ আনবিক শক্তি কমিশনের প্রধান ড. আমির হোসেনও এই বিদ্যালয়ের এক সময়ের কৃতি ছাত্র ছিলেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃস্থানীয় খালেদুজ্জামান, ডা: আব্দুস সোবহান, তফাজ্জল হোসেন চুন্নু, রফিকুল ইসলাম, ফজলুল হক, মো: আবুল হাসিম চেয়ারম্যান, আব্দুল হাকিম, মো: ইদ্রিস আলী, মো: বোরহান তালুকদার, আশুতোষ রায়, আ: হান্নান, আবুল খায়ের, মো: সিরাজ বক্স, কনু মিয়া, জসিম উদ্দিনসহ অনেকেই এ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ১৯৬৯’র গণঅভ্যত্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত আজিজুল হক হারুণের মিছিলেও ছিল আরকে উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। গৌরীপুর বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় কর্মরত ৩৪জনের মধ্যে ২৮জন প্রতিনিধিই এই বিদ্যালয়ের ছাত্র।
জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী তাঁর পিতা-রাজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর নামের রাজেন্দ্র-এর ইংরেজী আদ্যক্ষর ‘আর’ ও কিশোর- এর আদ্যক্ষর ‘কে’ এর সমন্বয়ে বিদ্যালয়টি আর, কে, উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিতি লাভ করে। জনশ্রুত আছে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি তাঁর এস্টেট ম্যানেজার বাণী কন্ঠ নিয়োগী এবং দেওয়ান নলিনী রায়-এর পরামর্শ নিয়েছিলেন। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা রাজা ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন রাজা রাজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর দত্তক পুত্র। শিক্ষা ও সঙ্গীতানুরাগী জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী তাঁর প্রজা সাধারণের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে অত্র বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উপজেলা ঈশ্বরগঞ্জে তাঁর স্ত্রী রাণী বিশেশ্বরী দেবীর নামে বিশেশ্বরী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় নামে আরও একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

Print Friendly, PDF & Email