Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

| |

ব্রেকিং নিউজঃ

বই কিনতে এসে আরেক ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি নেত্রকোনায় তোলপাড়!

আপডেটঃ 11:32 am | August 29, 2019

প্রধান প্রতিবেদক :
বই নিয়ে বাড়ি ফেরা হলো না কলেজছাত্রী ইয়াসমিনের। ভাগ্নিকে বাঁচাতে মামার প্রস্তুতকৃত ইয়ারঅ্যাম্বুলেন্স উঠার আগেই চিরবিদায়। বাঁচার জন্য ৪দিন লড়াই করেও হেরে গেলো। তবু বাঁচানো গেলো না তাকে। অপহরণ করে ধর্ষণে কলেজ ছাত্রীর মৃত্যু ঘটনায় প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় বইছে নেত্রকোনায়।
বই কিনতে এসে জন্ম নিলো আরেক ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি। মঙ্গলবার (২৭ আগস্ট/১৯) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো: আকবর আলী মুনসী। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে নিহত ইয়াসমিনের মা নাছিমা খাতুনকে মেয়ের হত্যাকারীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পূর্বধলা থানার ওসি মোহাম্মদ তাওহীদুর রহমান, ওসি (তদন্ত) মিজানুর রহমান, মামলার তদন্তকারী অফিসার (এসআই) আব্দুর রাজ্জাক।
মামলা ও ভিকটিমের পরিবার এবং পুলিশ সূত্র জানায়, ইয়াসমিন আক্তার (২২) বই কিনতে বুধবার সকাল ৯টায় বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসে শ্যামগঞ্জে। সে নেত্রকোণা জেলার পূর্বধলা উপজেলার খামারহাটি (কোনাপাড়া) গ্রামের মো. খোরশেদ আলীর কন্যা। পুর্বধলা থানার জালশুকা কুমুদগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের গেইটের সামনে এলে ওইদিন সকাল সাড়ে ১১টায় অপহরণের শিকার ইয়াসমিন আক্তার (২২)। তাকে নেত্রকোনা সদর উপজেলার শ্রীপুর বালী গ্রামের মৃত আবুল হাসেমের পুত্র মো. আলমগীর হোসেন (২৪) মোটর সাইকেলযোগে অপহরণ করে। কলেজছাত্রীকে ফুসলাইয়া বিয়েসহ নানা প্রলোভন দেখিয়ে অজ্ঞাতনামা ২/৩জনের সহযোগীতায় ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার সদরের এক ভাড়া বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে একাধিকবার জোরপূর্বক ধর্ষণের শিকার হন কলেজছাত্রী। ধর্ষণে বাধা দেয়ায় ধস্তাধস্তি করতে গিয়ে গুরুত্বর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।
এদিকে বিকাল থেকেই মেয়ের সন্ধানে পরিবারের লোকজন আত্মীয়-স্বজন ও বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করতে থাকেন। বৃহস্পতিবার সকালে খবর পান আলমগীরের সঙ্গে ইয়াসমিন শ্যামগঞ্জ এলাকায় রয়েছে। খবর পেয়ে মা ছুটে আসেন। মেয়ের মাকে দেখেই শ্যামগঞ্জ রেলগেইট এলাকায় কলেজছাত্রীকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় আলমগীর। সেখান থেকে কলেজছাত্রীকে উদ্ধার করে তার মা নাছিমা আক্তার ও তার মামা আবুল কালাম আজাদ নিয়ে যান নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে। বিস্তারিত ঘটনার বলার পর এক পর্যায়ে জ্ঞান হারান ইয়াসমিন। তারপর তাকে দ্রুত নিয়ে যান ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে দু’দিন ছিলো সাইফসার্পোটে। রোববার (২৫আগস্ট/১৯) তার মামা আবুল কালাম আজাদ ঢাকায় নিয়ে যেতে প্রস্তুত করেন ইয়ারঅ্যাম্বুলেন্স। সেই ইয়ারঅ্যাম্বুলেন্সে তার আর উঠা হয়নি। সকাল ৮টা ৩০মিনিটে চলে যান না ফেরার দেশে। ইয়াসমিন নেত্রকোনা আবু আব্বাছ ডিগ্রী কলেজের ¯œাতক তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী।
এ ঘটনায় রোববার তার মা নাছিমা আক্তার বাদী হয়ে পূর্বধলা থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ আলমগীর হোসেনকে গ্রেফতার করে বিজ্ঞ আদালতে সোর্পদ করেন। সোমবার বিজ্ঞ আদালত তাকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
তার মামা আবুল কালাম আজাদ জানান, পারিবারিক সম্পর্কের জের ধরেই আলমগীরের সঙ্গে ইয়াসমিনের পরিচয়। ইয়াসমিনের ফুফাতো ভাই গোলাম মোস্তফার চাচাতো ভাই হলো আলমগীর হোসেন। এ সম্পর্কের জের ধরে আত্মীয় বাড়িতে বেড়ানোর কথা বলে নিয়ে গেলে একাধিকবার জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। ধর্ষণে বাধা দেয়ার কারণেই আজ জীবন দিতে হলো ভাগ্নীর।
ইয়াসমিনের মৃত্যুর সংবাদ কলেজে পৌঁছার পর সহপাঠী ও শিক্ষকরাও ক্ষোভ ফুসছেন। কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। অপরদিকে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান নেত্রকোনা স্বাবলম্বীর মানবাধিকার কর্মী কোহিনূর বেগম। তিনি বলেন, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। সেই সাথে এ ধরনের ঘটনা পুন:রায় যেন না ঘটে তার জন্য মেয়েদেরকেও সচেতন হতে হবে।
দু’চোখ জুড়ে প্রতিবাদ অশ্রুসিক্ত সত্তুরোর্ধ নানা মো. শামছ উদ্দিন ও নানী নুরজাহান। নাতীকে হারিয়ে বারবার মোর্চা যাচ্ছেন নানী। নানা দু’হাত উপরে তুলে নাতীর বিচার প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, ওকে মেরে ফেলা হয়েছে। ধর্ষকেরও ফাঁসি চাই। মেয়ের ছবি বুকে জড়িয়ে বারবার জ্ঞান হারান মা নাছিমা খাতুন। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের হত্যাকারীর ফাঁসি চাই, আর কিছু না।’
মা নাছিমা খাতুন বাঁশ-বেতের কাজ করে সংসারটা গড়ে তোলেন। দুই পুত্র আর এক কন্যার সংসারে ইয়াসমিনকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। ইয়াসমিনেওর স্বপ্ন ছিলো একজন আদর্শ শিক্ষক হওয়ার। সে লক্ষ্য পূরণে পড়ার পাশাপাশি বেসরকারি এনজিও সংস্থার আশা’র শিক্ষা কার্যক্রমে লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন। ইয়াসমিনের পাঠের হাতেগড়ি ব্রাহ্মণ কড়েহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এরপর ২০১৪সালে বাইঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ২০১৬সালে শ্যামগঞ্জ হাফেজ জিয়াউর রহমান ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচএসসি উর্ত্তীণ হয়। মানুষ গড়ার কারিগর হওয়ার ব্রত নিয়ে শিক্ষা অর্জনের জন্য ভর্তি হয় আবু আব্বাছ ডিগ্রী কলেজে। বাবার অসুস্থ্যতা, সংসারের টানেপড়েন থামাতে পারেনি ইয়াসমিনকে। তার এক ভাই মোমেন এসএসসি পাস করার পর গার্মেন্টে চাকুরী নেয়। আরেক ভাই বাদল সবে ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ে। স্বপ্নছিলো ইয়াসমিনকে ঘিরেই।
উল্লেখ্য যে, ইয়াসমিন ট্রাজেডির পরের দিন এবার আরেক ইয়াসমিনের মৃত্যু! ২৪ বছর আগে ১৯৯৫সালে ২৪আগস্ট দিনাজপুরে পুলিশ সদস্যের হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছিল ইয়াসমিন। তখন থেকেই এ দিনটি সারাদেশে ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

টি.কে ওয়েভ-ইন

Print Friendly, PDF & Email