Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

| |

ব্রেকিং নিউজঃ

রানাপ্লাজা ট্র্যাজেডি: মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা রোজিনার দিনকাল

আপডেটঃ 9:13 pm | February 06, 2018

 

রাকিবুল ইসলাম রাকিব
ওরা দুই বোন। রোজিনা বেগম ও মর্জিনা আক্তার। দুজনেই জীবিকার তাগিদে কাজ করতেন সাভারের রানাপ্লাজার তৃতীয় তলায় পোশাক কারখানায়। শত কষ্টের মাঝেও তাদের সংসার গোছানোর স্বপ্নটা অল্প অল্প করে এগোচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে রানাপ্লাজা ধসের ঘটনায় মর্জিনার মৃত্যু হয়। আর ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়ে তিন দিন পর মৃত্যুকে জয় করে নিজের হাত নিজে কেটে বেরিয়ে আসেন রোজিনা বেগম। এরপর দীর্ঘদিন ঢাকায় চিকিৎসা শেষে রোজিনা ফিরে আসেন নিজ বাড়িতে। রোজিনার বাড়ি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের গাজীপুর গ্রামে। তার বাবার নাম ছফুর উদ্দিন। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে রোজিনা সবার বড়। বিভিন্ন সংস্থার অনুদান থেকে পাওয়া টাকায় ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের গাজীপুর বাজারের পাশে জমি কিনে নতুন বাড়ি নির্মাণ করেছেন রোজিনা। সেই বাড়িতেই স্বামী ও সন্তানদের এখন তার দিন কাটে। তবে বিভীষিকাময় সেইসব দিনের দুর্বিষহ স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়ায় রোজিনাকে।
গত মঙ্গলবার দুপুরে এই প্রতিবেদক যখন রোজিনার বাড়িতে যান, তখন বাড়ির আঙ্গিনায় বসে বড় মেয়ের সাথে গল্প করছিলেন রোজিনা। পরিচয় দেওয়ার পর ঘরের ভেতরে নিয়ে যান। রানাপ্লাজা ধসের দিনের ঘটনা শুনতে চাইলে রোজিনার চোখের কোণ জলে ভিজে আসে। চোখের জল মুছতে মুছেতে রোজিনা বলেন ওই ঘটনা মনে করলে আমার কিছু ভাল লাগে না। আমি ওই দিনগুলোর কথা ভুলতে চাই। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে ধ্বংসস্তুপ থেকে বেঁচে আসার গল্প বলতে রাজি হন।   এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, আগে থেকে রানাপ্লাজার ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ায় ঘটনার দিন সকাল ৮টার শিফটে শ্রমিকরা কেউই কাজে মনোযোগী হতে পারছিলো না। বেশির ভাগ শ্রমিক নিজেদের মধ্যে আতঙ্ক নিয়ে কথা বলছিলো। আনুমানিক পৌনে ৯টার সময় আমার মেশিনের পাশের একটি পিলার জুরজুর করে ভেঙে পড়তে শুরু করে। শুরু হয় শ্রমিকদের চিৎকার আর আর্তনাদ। যে যার মত ছুটছে ফ্লোর জুড়ে। কেউ খুঁজছে সিঁড়ির পথ। এরপর আর কোনো কিছুই কথা মনে নেই। চেতনা ফেরার পর চোখ মেলেই দেখি ঘোর অন্ধকার। দিন না রাত বুঝতে পারছিলাম না। বাইরে থেকে অনেক মানুষের চিৎকার আর মাইকের শব্দ পাচ্ছিলাম। এক সময় টর্চ লাইটের আলো দেখতে পেলাম। কিন্তু গলা শুকিয়ে যাওয়ায় কথা বলতে পারছিলাম না। পানির পিপাসায় বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। বাম হাতটা আটকে গিয়েছিল পিলারের নিচে। পা দুটো চাপা পড়েছে মেশিনের নিচে। সামান্য নড়াচড়াও করা যাচ্ছিল না। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তুপ সরিয়ে আমাকে বের করে আনার অনেক চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। অনেকটা দূর থেকে তারা আমার সাথে কথা বলতো। একটা পানির বোতল ঢিল দিয়ে পৌঁছানো হয় আমার কাছে। নিজের হাতে পানি পান করতে পারেনি। ঢিল দেওয়ার সময় ছিটকে কয়েক ফোঁটা পানি মুখে পড়ে। আরও কিছু সময় পর একজন চিকিৎসক দূর থেকে আমার সঙ্গে কথা বলে শারিরীক অবস্থা জানেন। বাম হাতটা ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়েছিল। এভাবেই কাটে দুই দিন। উদ্ধারকারী দল ও চিকিৎসক নিয়মিত যোগযোগ করে যাচ্ছিলো। দ্বিতীয় দিন রাতে চিকিৎসক আমাকে প্রস্তাব দেন নিজে নিজে বাম হাতটা কেটে বের হয়ে আসতে। কিছুতেই সেই সাহস করতে পারছিলাম না। দ্বিতীয় দিন গভীর রাতে জীবন বাঁচানো জন্য নিজের নিজের হাত কাটার সিদ্ধান্ত নিই। চিকিৎসকের শিখিয়ে দেওয়া পদ্ধতিতে তৃতিয় দিন দুপুরে বিশেষ ব্লেড দিয়ে নিজের বাম হাত কেটে বের হই ধ্বংস্তুপের নিচ থেকে। শরীর ফুলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। এরপর সিএমএইচ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সিআরপিতে ৭ মাস চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ্য হই। কথা প্রসঙ্গে রোজিনা বলেন‘ ধ্বংসস্তুপে চাপা থাকার সময় বারবার মনে হচ্ছিল ছোট বোন মর্জিনার কথা। আমরা দুই বোন পাশাপাশি কাজ করতাম। ভবন ভেঙে পরার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দুজন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। তখন শুধু মর্জিনার কথাই মনে পড়তে থাকে। ও কি বেঁচে আছে না মরে গেছে তাই ভাবতে থাকি। আমি বেঁচে ফিরলেও তাকে আর খোঁজে পাইনি। পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারি মর্জিনা ধ্বংসস্তুপে চাপা পড়ে মারা গেছে। জুরাইন কবরস্থানে মর্জিনাকে দাফন করা হয়েছে। এরই ফাঁকে ঘরে এসে উপস্থিত হয় রোজিনার স্বামী সাইদুল ইসলাম। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন একবার পহেলা বৈশাখে মর্জিনা কিছু ছবি তুলেছিল। সহকর্মীদের দেখানোর জন্য মর্জিনা ছবিগুলো কর্মস্থালে নিয়ে গিয়েছিল। ধ্বংসস্তুপের নিচে ছবিগুলোও চাপা পড়ে শেষ হয়ে গেছে। এরপর ছোট একটা ছবি ছিলো। সেটা এক সাংবাদিক ভাই নিয়ে যায়। পড়ে আর ফেরত পাইনি।


রোজিনা বলেন, খুব অল্প বয়সে আমার বিয়ে হয়। স্বামীর একার উপার্জনের টাকায় ঠিক মতো সংসার চলছিল না। তাই রানা প্লাজার তৃতীয় তলায় চাকরি নেই। কিন্তু সেটাই জীবনের কাল হয়ে দাড়ায়। এখন রোজিনার সংসারে দুই মেয়ে। বড় মেয়ে রিমি আক্তার তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ছোট মেয়ে সাদিয়া আক্তারের বয়স ২ বছর। স্বামী সাইদুল ইসলাম গ্রামে চটের বস্তার ব্যবসা করেন। রোজিনা বলেন, অনেক মানুষের কাছে থেকে অনেক সাহয্য সহযোগিতা পেয়েছি। নতুন বাড়ি করেছি। কিন্তু কাজ করে খাওয়ার মত আনন্দ নেই তাতে। নিজের মেয়েদের জন্য ভাত রান্না করতে গেলেও কারও সাহায্য লাগে। এখনো বাম হাতে ব্যাথ্যা হয়। বুকে ব্যাথ্যা আর শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন রোজিনা। নিজের স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে রোজিনা বলেন,স্বপ্ন ছিলো পড়ালেখা করে বড় চাকরি করবো। কিন্তু অভাবের কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। এখন স্বপ্ন দুই মেয়েকে ভালো পড়াশোনা করে মানুষের ভালো চাকরি করুক। কারণ আমরা কখনোই চাইনা আমাদের সন্তানরা বড় হয়ে পোশাক কারখানায় কাজ করুক। আর যে ব্যক্তির জন্য (রানা প্লাজার মালিক) এতো মানুষের প্রাণহাণি হলো, সহকর্মীরা পঙ্গুত্ব বরণ করলো, তাঁর অবশ্যই বিচার হওয়ার উচিৎ।

Print Friendly, PDF & Email