Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

| |

হাসপাতালে ডাক্তার আসেননি! বড়কর্তার দম্ভ ‘যা পারেন করেন’

আপডেটঃ 11:39 pm | February 06, 2018

মো. রইছ উদ্দিন :
৭০ছুঁইছুঁই করে আলেকজান বেওয়া। নাতির সাথে লাঠিতে ভর করে এসেছেন সেবা নিতে। ডাক্তারের চেম্বারের সামনে সকাল ৯টা থেকে বসা। তিনি এ প্রতিবেদককে দেখেই বললেন, অ্যাব্বাগো উঠ্যাতা হারি (পারি) না। হরিলটা (শরীর) মেলা (খুব) দুবল। এ কয়েকটি বাক্য বলতে বলতেই হাঁপিয়ে উঠছেন। ঘড়ির কাটায় তখন ১০টা ১৬মিনিট বাজে। সেবা না পেয়েই এভাবে প্রতিদিন শতশত রোগী শূন্য হাতে বাড়ি ফিরছেন।
হাসপাতালের বর্হিঃবিভাগে মেডিকেল অফিসার কয়টায় আসবেন ১মিনিট ৬ সেকেন্ডের মুঠোফোনের আলাপচারিতায় অপরপ্রান্ত থেকে হাসপাতালে বড়কর্তা ডা. মো. রবিউল ইসলাম জানান, সাড়ে ১০টায় হাসপাতালের বর্হিঃবিভাগে ডাক্তার চলে আসবেন। ইতোমধ্যে হাসপাতালের টিকেট কাউন্টার থেকে দীর্ঘলাইনে দাঁড়িয়ে মহিলা ৩৬জন, শিশু ১১জন ও পুরুষ ৯জন টিকেট সংগ্রহ করে ডাক্তারের বন্ধ দরজার সামনেই দ্বিতীয় দফায় লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। ১০টা ৩২ মিনিটে হাসপাতালের বহিঃবিভাগে প্রবেশ করেন দন্ত বিভাগের টেকনোলজিস্ট মো. দেলোয়ার হোসেন। এ দিকে হাসপাতালের এক্স-রে বিভাগে প্রায় ৪বছর যাবত ঝুলছে তালা।
১০টা ৪৫মিনিটে তখনও মেডিকেল অফিসারের দেখা মিলছে না বহিঃবিভাগে। বিষয়টি অবগত করে বড়কর্তাকে দ্বিতীয়বার মুঠোফোনে কল দেয়ায় বিরক্ত আর রাগান্বিত হয়ে উঠেন। তিনি বলেন, ডাক্তার হৃদী আছেন। ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট এসেছেন। তখন ঘড়ির কাটায় ১০টা ৪৭মিনিট, বড় কর্তার কক্ষ থেকে বেড়িয়ে বহিঃবিভাগে আসছেন ডা. হৃদী। তখনও এ প্রতিনিধির সাথে মুঠোফোনে আলাপ চলছিলো। ডাক্তার হৃদী এইমাত্র বহিঃবিভাগের দিকে যাচ্ছেন। কথাটি বলতেই তিনি ক্ষেপে যান-দম্ভ নিয়েই বলে উঠেন, ‘যা পারেন করেন’। এ দৃশ্যটি মঙ্গলবার (৬ ফেব্রুয়ারি/১৮) ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। তবে সরকারি বাতায়ন ওয়েবসাইড http: //health.gouripur.mymensingh.gov.bd সিটিজেন চার্টারের ৪নং ক্রমিকে লিখা রয়েছে এ বিভাগে ‘সকাল ৮ঘটিকা হইতে দুপুর ২.৩০ঘটিকা পর্যন্ত সেবা দেয়া হয়।’
হাসপাতালের বড়কর্তাই স্বীকার করেন হাসপাতালের বহিঃবিভাগ চালু হয় সকাল সাড়ে ১০টা। রোগীরা জানান, দুপুর ১টার মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায় এ বিভাগের দরজা। এ বিষয়ে হাসপাতালে সেবা নিতে আসা বোকাইনগর ইউনিয়নের গড়পাড়া গ্রামের আব্দুল লতিফ (৪০), পৌর শহরের সতিশা গ্রামের নওয়াব আলী (৩৮), নওপাই গ্রামের কদরবানু (৬০), রামগোপালপুরের শামীম আনোয়ার বিল্লাল (৩০) জানান, দুই ইঞ্চি প্রস্থ আর আড়াই ইঞ্চি দৈর্ঘ্যরে একটি টিকেটে দু’চারটি ট্যাবলেট লিখে চিকিৎসার দায়সারেন। তবে পৌর শহরের রোকেয়া আক্তার (৩০), নামাপাড়ার আছমা আক্তার (৩৫)সহ অনেকেই গাইনী বিভাগের ডাক্তার গাইনী কনসালটেন্ট ডা. আয়শা বেগের সেবায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। যদিও তিনি ওই সময় তার কক্ষে নেই। বহিঃবিভাগে সেবা সন্তুষ্টির তালিকায় আরো রয়েছেন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার একেএম মাহফুজুল হক, দন্তবিভাগের টেকনোলজিস্ট মো. দেলোয়ার হোসেন, সিনিয়র স্টাফ নার্স মো. রফিকুল ইসলাম, মোছা. রুকিয়া আক্তার, নার্স মরিয়ম আক্তার রিপা। সেবা নিতে আসার মানুষদের ভাষ্যমতে, তারাই বড়ো ডাক্তার! ডাক্তার নেই বহিঃবিভাগে এসেও সেবা পাচ্ছেন না, এমন অভিযোগ হাজারো মানুষের। তাদেরই একজন রামগোপালপুর ইউনিয়নের গুজিখাঁ গ্রামের তোরাব আলী (৪০)। তিনি জানান, সকাল ৯টা থেকে বসে আছি। ডাক্তার আসে নাই, তাই চলে যাচ্ছি। লামাপাড়া গ্রামের আব্দুল হাই (২৮) জানান, এসেছিলাম পেটে ব্যথা, সর্দি নিয়ে। রিস্কা ভাড়া দিলাম ২৫টাকা। হাসপাতাল দিলো ১০টি হিস্টাসিন ট্যাবলেট।
জানুয়ারি মাসেই চিকিৎসা সেবার অবহেলা আর ভুল চিকিৎসার স্বীকার করে একজন ব্যবসায়ীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে এ হাসপাতালে। ডাক্তার বাঁচাতে সেই মৃত্যুর বিষয়টিও ধামাচাপা দেয়ার রয়েছে অভিযোগ রয়েছে নিহত রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের। অপরদিকে ৫০শয্যার হাসপাতালের ভবন ২০১৬সালের ১৬জানুয়ারি উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। উদ্বোধনের দু’বছর অতিক্রম হলেও এখন পর্যন্ত ৫০শয্যা হাসপাতালের সেবা চালু হয়নি।
এ প্রসঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, ৫০শয্যার চালুর জন্য বারবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। ৩১শয্যার এ হাসপাতালসহ উপজেলায় ২০জন ডাক্তারের স্থলে ১৭জন ডাক্তার কর্মরত রয়েছেন। কর্মরতদের মধ্যে ১জন অসুস্থ্য, ২জন প্রেষণে অন্যত্র কর্মরত আছেন। ডাক্তার সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মর্জিনা আক্তার বলেন, সমস্যা সমাধানের জন্য জেলা সমন্বয় সভা ও উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ স্থায়ী কমিটির সভাপতি উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান রাবেয়া ইসলাম ডলি জানান, জননেত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূলে সেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষে গ্রামে গ্রামে কমিউনিটি কিনিকও করছেন। অথচ উপজেলা হাসপাতালে মানুষ সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন, এটা দুঃখজনক। বীরমুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিন আহমেদ এমপি এ প্রসঙ্গে বলেন, মানুষ যাতে সেবা বঞ্চিত না হন, সে জন্য বিষয়টি দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের নিকট তথ্য ও সেবা পৌঁছে দেয়ার জন্য ‘বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন’ করেছেন। সরকারের শতকোটি টাকা ব্যয়ে চালিত এ বাতায়নেও গৌরীপুর হাসপাতালের রয়েছে তথ্য বিভ্রাট।

Print Friendly, PDF & Email