Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

| |

গৌরীপুরে গোরস্থানে প্রিয়জনদের লাশ খুঁজে পাচ্ছেনা স্বজনরা

আপডেটঃ 10:18 pm | March 11, 2018

লাশ রক্ষায় গ্রামবাসীর পাহাড়া ॥

প্রধান প্রতিবেদকঃ
মা মা করে কবরে পাশে কাঁদছে বাচ্চু। প্রায় দেড় বছর আগে এই কবরেই শায়িত করেছিলেন তার মা নুর জাহান বেগমের লাশ। চারদিক থেকে খবর আসছে কবরে লাশ নেই। তার মায়ের কবরেও মাথার অংশে ফাঁকা দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তার হৃদয়বিদারক কান্না দেখে গ্রামবাসী এসে গোরস্থানে জড়ো হন। মনের সন্দেহ আর গ্রামবাসীর শংকা-লাশ নেই আতঙ্ক দূর করতেই কোদাল নিয়ে সেই কবর খুঁড়েন।
একটি চক্রের লাশ চুরির ঘটনা শোনে ভাংনামারী ইউনিয়নের হাজী আব্দুল মজিতের পুত্র আবুল হাসাদ বাচ্চু ছুটে যান মায়ের কবরে। কবরের মাথার অংশে দুই-আড়াই ফুট ফাঁকা দেখে চমকে উঠেন। মায়ের লাশ আছে-কিনা নিশ্চিত হতে, গ্রামবাসীকে নিয়ে কবরের মাটি সরিয়ে দেখেন ‘লাশ’ নেই। স্ত্রী’র লাশ নেই এ কথা শোনেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন হাজী আব্দুল মজিত। বাচ্চু জানায়, তার মা নুর জাহান বেগম প্রায় দেড় বছর আগে মারা যান। মায়ের শোক ভুলতেই পারছেন না, এবার মায়ের লাশও নেই। যেখানে দাঁড়িয়ে দিনে দু’বার মোনাজাত করতাম।
প্রিয়জনের লাশের সন্ধানে, চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। কবরে লাশ নেই; এ খবর ছড়িয়ে পড়ায় ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ভাংনামারী ইউনিয়নে তোলপাড় শুরু হয়েছে। মাত্র দুই-আড়াই ফুট ফাঁক করে অভিনব পদ্ধতিতে একের পর এক কবরের লাশ (কংকাল) চুরির ঘটনায় গ্রামবাসী হতবাক। এবার প্রিয়জনের ‘লাশ রক্ষা’র পাহাড়া দিচ্ছেন গ্রামবাসী। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফুঁসে উঠছে ইউনিয়নবাসী।
লাশ বিক্রির টাকার ভাগবাটোয়ারা আকির হোসেন, রাসেল মিয়া আর হযরত আলী নামে তিনজন ময়মনসিংহে বিবাদ সৃষ্টি হয়। এ চক্রের সদস্যদের দ্বন্দ্বের কারণেই লাশ চুরির ঘটনা ফাঁস হয় ময়মনসিংহে। ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে সেখানে এ ঘটনা শোনতে পান ভাংনামারী ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের সাইফুল ইসলামের পুত্র নয়ন মিয়া। এ চক্রের ৩জনের বাড়িই তার এলাকায়। তাই তিনি রোববার বাড়িতে তার ভাই ফয়সাল ইসলামকে ফোনে এ তথ্য জানান। তার দাদা ওয়াহেদ আলী ও দাদী কদরবানু’র কবরে লাশ আছে কি-না জানতে চান? পরিবারের লোকজন ছুটে গিয়ে দেখেন, দু’টি কবরেই দুই-আড়াই ফুট করে গর্ত (ফাঁকা)। কবরে লাশ নেই! এরপর ছুটে আসেন আত্মীয়-স্বজনও।
এরপরেই স্বজনের লাশের সন্ধানে চলে করব খোঁড়াখুঁড়ি। কুলিয়ারচর গ্রামের মৃত রুস্তম আলীর স্ত্রী হাসনা আক্তারের কবর খোঁড়ে লাশ পাওয়া যায়নি। তিনি মারা যান প্রায় ২বছর পূর্বে। ৩বছর পূর্বে মারা যান মৃত একিন আলীর পুত্র মোর্শেদ আলী। তার কবরেও লাশ নেই। গজারিয়া গ্রামের কেরামত আলীর পুত্র আব্দুর রাজ্জাক জানান, তার ভাই আবু চান ও সালেহা খাতুনের কবরেও লাশ নেই। একই গ্রামের মৃত বাছির উদ্দিনের স্ত্রী জুবেদা খাতুনের কবরেও লাশ নেই। তার পুত্র আব্দুল খালেক জানান, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরেও মায়ের কবর মেরামত করেছি। রাসেল আমার ছেলে বলেছে তার মায়ের কবর ভেঙ্গে গেছে, তারপর মেরামত করেছি। লাশ নেই, সেটা আগে বুঝতে পারি নাই। রোববার সারাদিনে গ্রামের লোকজন কবর খোঁড়াখুড়ি শেষে নিশ্চিত করেন ২১টি কবরে লাশ নেই। এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক, মরার পরেও মানুষ শান্তি পাচ্ছে না উল্লেখ করে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার আব্দুল বারেক জানান, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। পুরো এলাকাজুড়ে প্রিয়জনের লাশের সন্ধানে ছুটছেন স্বজনরা। খবর পেয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয় স্বজনরাও ছুটে আসছেন। এ ব্যাপারে ভাংনামারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মফিজুন নূর খোকা বলেন, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এলাকার মানবাধিকার কর্মী ফয়সাল ইসলাম জানান, মৃত্যুর পর ‘কবর’কে শান্তির জায়গা বলা হয়, আজ সেই করব থেকে লাশ চুরির ঘটনায়-আমরা বিস্মৃত। গ্রামবাসীর ধারণা, বিশেষধরনের কোনযন্ত্র দিয়ে পুরো লাশ এ ফাঁকা অংশ দিয়েই সহসায় চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে এ চক্রটি।
গৌরীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ দেলোয়ার আহম্মদ বলেন, লাশ চুরির ঘটনা শোনেছি, এখন পর্যন্ত কেউ মামলা করতে আসেনি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন গৌরীপুর থানার সভাপতি সিনিয়র আইনজীবী মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ বলেন, প্রশাসনের উচিত জড়িতদের খোঁজে বের করা।

বাহাদুর.কম/আইএ

Print Friendly, PDF & Email