Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

| |

ব্রেকিং নিউজঃ

আকাশে মেঘ জমলে বাজে ছুটির ঘণ্টা!

আপডেটঃ 10:07 pm | April 30, 2018

প্রধান প্রতিবেদকঃ
‘স্যার, ওহন ব্লেডিং ওইবো’ ৩য় শ্রেণির ছাত্রী নাজমা আক্তারের প্রশ্নের উত্তর কারো জানা নেই। অথচ জেলা-উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ ও জরার্জীণ ভবনের তালিকার শীর্ষ নাম ‘কান্দুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। যে বিদ্যালয়ে ‘আকাশে মেঘ জমলে বাজে ছুটির ঘন্টা’। এটি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার রামগোপালপুর ইউনিয়নে অবস্থিত।
কান্দুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ ১৯৯৫সনে নূতন ভবনটি নির্মাণের পর থেকে ছাদ ছুঁষে পানি পড়ে। মাত্র ৫বছরেই ভবনটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যায়। উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ ও শিক্ষা বিভাগের তদন্ত শেষে ২০১৩সালের ২৯ এপ্রিল ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই শিক্ষার্থীরা খোলা আকাশের নিচে পাঠদান করছে। এ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২শ ২২জন। প্রতিবছর সমাপনি পরীক্ষা অংশ নিয়ে শতভাগ পাস ও ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিসহ রয়েছে সাধারণ বৃত্তি ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তি। তবে ওরা ক্লাস করে নীল আকাশের নিচে!
বিদ্যালয়টির এমন পরিস্থিতি নিয়ে দৈনিক যুগান্তর ও বিভিন্ন প্রিন্ট-ইলেকট্টনিক্স মিডিয়ায় একাধিকবার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। দৈনিক যুগান্তরের প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে বুয়েটের শিক্ষার্থীদের অর্থায়নে ২০১৬সালে তাৎক্ষনিকভাবে টিনশেডের একটি ঘর নির্মাণ করে দেন। বুধবার (২৫ এপ্রিল/১৮) সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ভবনটি গোয়ালঘরে পরিণত হয়েছে। ছাদের পলেস্তার ও খুঁটির প্লাস্টার কষে যাচ্ছে। ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র ইউসুব আলী জানান, টিনশেডের চারদিকে বেড়া নেই। বৃষ্টি এলেই ভিতরে পানি আসে, বই রক্ষার জন্য পলিথিন নিয়ে আসতে হয়, বন্ধ হয়ে যায় ক্লাস। প্রধান শিক্ষক মো. আজাদ মোস্তফা জানান, ৬বছরে ১৯বার আবেদন করেছি। এ দিকে বিদায়ী উপজেলা শিক্ষা অফিসার জুয়েল আশরাফ জানান, এ বিদ্যালয়টি যতবার চাহিদা প্রেরণ করা হয়, ততবারই এক নাম্বারে থাকে, কেন হচ্ছে না? তা আমারও বোধগম্য নয়। এদিকে আবারও ৮টি বিদ্যালয়ে নূতন ভবনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান উপজেলা প্রকৌশলী আবু সালেহ মো. ওয়াহেদুল হক। সেখানেও কান্দুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম নেই।
একই অবস্থায় পৌর শহরের মুকুল নিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। ভূমিকম্পের কারণে ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। পাঠদানের চলছে গাছতলায়। প্রধান শিক্ষক শুক্লা রানী সরকার জানান, একটি টিনের শেড করা হয়েছে। গরমে শিক্ষার্থীরা সেখানেও বসতে পারছে না।
গৌরীপুর ইউনিয়নের বোরহান উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ছাদ ছুঁষে পানি পড়ে। পলেস্তার উঠে গেছে। খুঁটিও নড়বড়ে। ধুরুধুরু বুক কাঁপে, কখন ভেঙ্গে পড়ে! ছাদের পলেস্তার উঠে পড়েছে। ভিমে ফাটল। দেয়ালের পলেস্তার উঠে গেছে, খসে পড়চ্ছে ইট। বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম মিন্টু জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে ভবন নির্মিত না হলে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধও হয়ে যেতে পারে।
অপরদিকে মাওহা ইউনিয়নের বিষমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের ৪টি কক্ষের ৪নং কক্ষে ফাটল, অফিস কক্ষের ছাদ ও ভিমে ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রধান শিক্ষক তহুরা খাতুন জানান, ২শ ১৮জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিতেই ক্লাস নিতে হচ্ছে। তবে এ ভবনটি নির্মাণ হয় ১৯৯৪-৯৫ অর্থবৎসরে। এমন দৃশ্য চোখে পড়ে বোকাইনগর ইউনিয়নের গোবিন্দনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। প্রায় ৩শ ছাত্রছাত্রী নিয়ে আকাশে বিদ্যুৎ চমকালেই চমকে উঠেন প্রধান শিক্ষক সৎঅল মনি।
এদিকে আহসানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি ভবনের সিংহভাগ টিন ২বছর পূর্বে কালবৈশাখী ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যেটুকুতে টিন আছে তার নিচে শুষ্ক মৌসুমে ক্লাস চললেও বর্ষা মৌসুমে বন্ধ হয়ে যায়। অপর ভবনটিও পরিত্যক্ত। প্রধান শিক্ষক বিপুল চন্দ্র সেন জানান, ২শ ৭৫জন ছাত্রছাত্রীর ক্লাসরুম নিয়ে তিনি বিপাকে রয়েছেন। ব্র‏হ্মপুত্র নদের পাড়ে টিনশেডে চলছে সুতিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান। ঝড়ে উড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে আর রোদে ঘামে ছাত্রছাত্রীরা। এ বিদ্যালয়ের ২শ ২৫জন ছাত্রছাত্রী ক্লাস নিতে পারছেন না বলে স্বীকার করেন প্রধান শিক্ষক মোঃ শফিউল আলম।
অপরদিকে শৌলঘাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণিতে ৩জন, ১ম শ্রেণিতে ৪২জন, ২য় শ্রেণিতে ৩৫জন, ৩য় শ্রেণিতে ২৮জন, ৪র্থ শ্রেণিতে ২৫জন ও ৫ম শ্রেণি ১৮জন অধ্যয়ন করছে। প্রধান শিক্ষক মোঃ জসিম উদ্দিন জানান, ভবন নেই, টিন শেড, বেড়াও নেই। ধুলাবালি ঝাড় দিয়ে লেখাপড়া করতে হচ্ছে নেই কোন ল্যাট্টিনও। অনুরূপ অবস্থায় রয়েছে শাহাবাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমান জানান, ২শ ১০জন শিক্ষার্থী আছে। তাদের পাঠদানের কক্ষ নেই। এবার ৫ম শ্রেণির সমাপনি পরীক্ষা অংশ নিবে ২৬জন।
একই অবস্থা সিংরাউন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। প্রধান শিক্ষক কুতুব উদ্দিন জানান, ২শ ৫২জন ছাত্রছাত্রীকে বসার স্থানই দিতে পারছি না। এবার ৫ম শ্রেণিতে ৩৫জন পরীক্ষা অংশ নিবে। ১৯৯৪-৯৫সনের নির্মিত ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১৫-১৬অর্থ বছরে নিজমাওহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের ছাদে মেরামত করা হয়। এরপরেই ফাটল দেখা দেয় ভিম ও দেয়ালেও। চরম ঝুঁকিতে চলছে ১শ ৬৭জনের পাঠদান। প্রধান শিক্ষক নাজমুল ইসলাম জানান, বিষয়টি শিক্ষা অফিসকে অবহিত করা হয়েছে। ১শ ৬৯জন ছাত্রছাত্রীর নেই কোন ল্যাট্টিন। পুরো ভবন জুড়ে ফাটল। ঝুঁকিতেই চলছে ক্লাস জানালেন চানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ আব্দুল আজিজ।
৫৫৬জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে গিধাউষা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভবনের অভাবে শিক্ষার্থীরা পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান প্রধান শিক্ষক মোঃ লুৎফর রহমান। এ বিদ্যালয়ে বিগত ৪বছর যাবত পাসের হার শতভাগ। এবছরও ৫ম শ্রেণির সমাপনি অংশ নিবে ৭৫জন ছাত্রছাত্রী। শিশু শ্রেণিতে ৬২জন, ১ম শ্রেণিতে ৮৪জন, ২য় শ্রেণিতে ১১১জন, ৩য় শ্রেণিতে ১২৬জন, ৪র্থ শ্রেণিতে ৯২জন অধ্যয়ন করছে। জরুরীভিত্তিতে পাঠদান কার্যক্রমের জন্য ৩টি কক্ষ প্রয়োজন।
উপজেলার সহনাটী ইউনিয়নের পেচাঙ্গিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে শিশু শ্রেণিতে ২৮জন, ১ম ২য় শ্রেণিতে ৪১জন, ৩য় শ্রেণিতে ৩৫জন, ৪র্থ শ্রেণিতে ২০জন ও ৫ম শ্রেণিতে ১৪জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে নির্মিত বিদ্যালয়ের ভবনটিও ঝুঁকিপূর্ণ। ভিমে ফাটল ধরেছে। পলেস্তার ধসে পড়চ্ছে। এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খোলা আকাশের নিচে পাঠদানে বাধ্য হচ্ছেন। ৪টি কক্ষের সবকয়টি দিয়েই ছাদ চুয়ে পানি পড়ে নিজাম উদ্দিন আউলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রধান শিক্ষক মোঃ হাবিবুর রহমান বিদ্যালয়ের ২১৬জন ছাত্রছাত্রীর পাঠদান ও অফিসিয়াল কার্যক্রম নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। শতভাগ পাসের সুনাম আর বৃত্তি পেলেও ভবন হচ্ছে না পুম্বাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রধান শিক্ষক আব্দুল বারী জানান, এ বিদ্যালয়ে ৩১৪ জন ছাত্রছাত্রী অধ্যয়ন করছে। খোলা আকাশের নিচে চলছে পাঠদান কার্যক্রম। একই অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ জরাজীর্ণ ভবনেই চলছে গোবরা, চিতরাটিয়া, গোবিন্দপুর, শালীহর, প্রমোদবালা, মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসিম, রামকৃষ্ণপুর, কাশিচরণ, লাটুরপয়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম।


বিদায়ী উপজেলা শিক্ষা অফিসার জুয়েল আশরাফ জানান, মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিন আহমেদ এম.পি ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ, পরিত্যক্ত ও পাঠদান অনুপযোগী বিদ্যালয়ে দ্রুত ভবনের নির্মাণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগকে পত্র দিয়েছেন। উপজেলা শিক্ষা কমিটির সভাপতি উপজেলা চেয়ারম্যান আহাম্মদ তায়েবুর রহমান হিরণ জানান, শিক্ষার মান উন্নয়নের পাঠদান উপযোগী আবাসন প্রয়োজন, এ বিষয়ে উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

বাহাদুর.কম/আরইউ/আইএ

Print Friendly, PDF & Email