Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

| |

মফস্বল সাংবাদিকতায় সুরেশ কৈরী ছিলেন আলোকবর্তিকা

আপডেটঃ 12:48 am | May 13, 2018

মো. রইছ উদ্দিন :
সুরেশ কৈরী। একজন সংবাদকর্মী। এই পরিচয় তাঁর পূর্ণতা আনে না। বলা যায়, মানবিকগুনাবলী সম্পূর্ণ একজন আলোকিত মানুষ ছিলেন। বহু কর্মের সরল যোগফল হলো একজন সুরেশ কৈরী।
খেলার মাঠে সরব। ধারাভাষ্যকার। সংস্কৃতির বিকাশ। সমাজসেবক। এনজিও কর্মী। সাহসী এক কলম সৈনিক। প্রিয় এক মানুষের নাম ছিলো সুরেশ কৈরী। যিনি কর্মের মাধ্যমে জয় করেছিলেন গৌরীপুরবাসীর হৃদয়।
আজ থেকে ১৮বছর আগে এই দিনে তিনি চিরবিদায় নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করেন। এরপরে ফিরে আসেন মফস্বল সাংবাদিকতায়। সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সডিগ্রী অর্জনের পর উপজেলা পর্যায়ে রয়েছেন এমন সাংবাদিকের সংখ্যা খুবই কম। বলতে গেলে হয়তো তিনিই। শুধুই কী, সাংবাদিকতা করেছেন; তাও নয়। খেলেছেন, খেলোয়াড় তৈরি করেছেন, খেলার দায়িত্ব নিয়েছেন। উপজেলা পর্যায়ের অনুষ্ঠিত সিংহভাগ অনুষ্ঠানের ধারাভাষ্যকারও ছিলেন সুরেশ কৈরী।
আপসোস, সেই মানুষটির সাথে আমার সংবাদপত্র জগতে দেখা হয়নি। যতটুকু দেখেছি, গৌরীপুর উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস, মহান বিজয় দিবসে স্টেডিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে। তিনি ছিলেন সেই অনুষ্ঠানের ধারাভাষ্যকার। তখন আমি ছিলাম সতিশা যুব ও কিশোর সংঘ নামের একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড় সংগঠনের দায়িত্বে। যে সংগঠন আমাকে বেড়ে উঠতে বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছে। শিশু-কিশোরদের নিয়ে মাঠে শারীরিক কসরতেই এই গুণী মানুষের দেখা পেয়েছি।
পান চিবুতেন; মুখ নাড়ানোর সেই দৃশ্য আমার এখনও মনে পড়ে। নির্ধারিত সময় ৭ মিনিট, আর মাত্র ২ মিনিট বাকী আছে, সতিশা যুব ও কিশোর সংঘের সময় শেষ, এ ধরনের ঘোষণা এখনো আমার কানে বাজে। সেই মানুষটি আজ নেই ১৮বছর, ভাবতেই; শিউরে উঠি! সময়, এতো দ্রুত, বেগবান, চলছে অবিরাম, বাঁধাহীন, ঠিক তাই।
সুরেশ কৈরী সাংবাদিকদের নিয়ে ভাবতেন। তাদের পেশাগত দায়িত্ববোধ, মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকতা বিশেষ সহকর্মীদের ছিলেন প্রিয় বন্ধু। তিনি সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে থাকার প্রয়াসেই গৌরীপুর প্রেসকাব প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। এ প্রতিষ্ঠানের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। সক্রিয় সাংবাদিকতায় তিনি এ অঞ্চলে দৃষ্টান্তস্থাপন করেন। উত্তর ময়মনসিংহের অধিকাংশ উপজেলায় তিনি বিচরণ করেছেন। দৈনিক সংবাদের উপজেলা প্রতিনিধি ছিলেন। কিন্তু তাকে দেয়া তার পত্রিকা অফিসের এ সীমানায় তিনি কখনও মানেননি। ছুটে গিয়েছেন ধোবাউড়া, ফুলপুর, তারাকান্দা, ঈশ্বরগঞ্জ, নান্দাইল, কেন্দুয়া, পূর্বধলা উপজেলায়ও। সীমানাপাড়ি দেয়ার ক্ষেত্রে অবাক করেছেন আমাদের। সার সংকটের ঘটনা নিয়ে তিনি ঘোড়াশালেরও রির্পোট করেছেন।
সংবাদপত্রে সুরেশ কৈরীর কর্ম নবপ্রজন্মের সাংবাদিকদের পথ দেখাবে। তার সংবাদ ও সাংবাদিকতা নিয়ে এখন ভাবনার সময় এসেছে। সেই সংবাদে, ইতিহাসও রয়েছে। তারই লেখা দৈনিক সংবাদে ১৯৯৯ সালের ৮ মে প্রকাশিত হয় ‘ঠাকুরানদীঘি-তেলিগাতি সড়ক’। যা বর্তমান প্রজন্মের সাংবাদিকদের দু’টি স্থান চিনতে খুবই কষ্ট হবে। যা আমিও বুঝতেই পারেনি, তেলিগাতি চিনলেও চিনতে পারছি না ঠাকুরানদীঘি। গৌরীপুর প্রেসকাবের সাবেক সভাপতি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সংবাদদাতা জনাব শফিকুল ইসলাম (আমার প্রিয় মিন্টু ভাই) জানালেন, কলতাপাড়ার আগের নাম ছিলো ঠাকুরানদীঘি।


সীমানা ছাড়িয়ে অসংখ্য সংবাদ লিখেছেন সুরেশ কৈরী। হয়তো তাঁর সময়ের সমসাময়িক সাংবাদিকগণ আরো বিস্তারিত জানেন। তারপরেও শুধুমাত্র ১৯৯৯সালের কয়েকটি সংবাদ তুলে ধরছি। ১৯৯৯সালের ১৬জুন দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয় ‘উত্তর ময়মনসিংহের ৮টি থানায় মে মাসে খুন হয়েছে ৯জন’। ১৮মার্চ প্রকাশিত হয় ময়মনসিংহে বিশ্বকাপের উত্তেজনা শিরোনামে একটি সংবাদ। ১৬ অক্টোবর/১৯৯৯ লিখেছেন ‘উত্তর ময়মনসিংহে আমনের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা’। ১৯৯৯সালের ১২ নভেম্বর লিখেছেন আদমজী পাটকলের ক্রয়কেন্দ্র বন্ধ, ১৯জুন প্রকাশিত হয় ‘বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল, উদ্যোগের অভাবে গড়ে উঠছে না বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান’। ২৪ আগস্ট প্রকাশিত হয় ‘ঈশ্বরগঞ্জের ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের মুখোমুখি সংঘর্ষ’। ময়মনসিংহ শহরের যানজট নিয়ে তিনি প্রতিবেদন লিখেছেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ না থাকায়’। এ সংবাদটি ১৯৯৯সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়। এ ধরনের অসংখ্য প্রকাশিত সংবাদই প্রমাণ করে, তিনি সংবাদের খোঁজে নির্দিষ্ট সীমনা বা গন্ডিতে বদ্ধ থাকতেন না। দিক-বেদিক তিনি ছুটেছেন সংবাদের সন্ধানে।
সীমনা ছাড়িয়ে যাওয়া এই মানুষটির সংবাদ পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠার আরেক দিক ছিলো সেটা তিনি পাঠকদের কাছে উপস্থাপন করেছেন নিখুঁতভাবে। সংবাদের শিরোনামে ছিলো বৈচিত্র্যধর্মী ও আকর্ষণীয়। তারই প্রমাণ মিলে ১৯৯৯সালের ১৪ মে দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম ছিলো ‘একটি ময়না পাখি’, ২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় নির্বাচন নিয়ে প্রতিবেদন ‘ভাই বনাম ভাই’ আর ৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় আরেক সংবাদ ‘জ্যোতিষী প্রার্থী’, ২২ মে প্রকাশিত হয় ‘শুরু হয়েছে’। ১১জুন প্রকাশিত হয় আরেকটি প্রতিবেদন ‘নিজেরটা নিজেই’। ৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় ‘ব্রীজ এখন মরণফাঁদ’, ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় ‘দায়িত্বকার’ শিরোনামে আরো ২টি সংবাদ। ‘পলিথিনে মোড়ানো’ শিরোনামে প্রকাশিত হয় আরেকটি সংবাদ। ২০০০সালের ৮ মে প্রকাশিত এ সংবাদে যা ছিলো ‘গৌরীপুর পুলিশ উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের তাঁতকুড়া গ্রাম থেকে পলিথিনে মোড়ানো ২ বাক্স ভর্তি ২৪ টি এলএমজির খালি ম্যাগাজিন উদ্ধার করেছে। গত ৪ঠা মে পুকুরপাড়ে লাকড়ি কুড়াতে গিয়ে একটি কিশোর পলিথিন ভর্তি ২বাক্স দেখতে পায়। পরে গৌরীপুর থানায় খবর দিলে ওসি শেখ জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশ পলিথিনে মোড়ানো ২টি বাক্স ভর্তি ২৪টি এলএমজির খালি ম্যাগাজিন উদ্ধার করে। ম্যাগাজিন ও বাক্স দুটিতে মরিচা ধরেছিল।’
তিনি কৃষক ও কৃষির উন্নয়নেও অসংখ্য সংবাদ পরিবেশন করেন। ২০০০সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয় ‘গৌরীপুরে দশ টাকায় ১০টি বাঁধাকপি’, পানির স্তর নিচে নামছে, সার সংকট ইত্যাদি অসংখ্য সংবাদ লিখেছেন। ধানের মূল্য কম, কৃষি জমি তলিয়ে গেছে এ ধরনের সংবাদ প্রমাণ করে তিনি কৃষকদের সমস্যা নিয়েও ভাবতেন।
শহরের উন্নয়নেও নিবেদিত ছিলেন সাংবাদিক সুরেশ কৈরী। ২০০০সালের ১৩মার্চ গৌরীপুর পৌরসভার প্রধান সড়কগুলোতে যখন ধূলা উড়ছিলো ঠিক সেই সময়ে সংবাদ লিখেছেন, শিরোনাম ছিলো ‘ধূলোর শহর’। ১৯৯৯সালের ২২ সেপ্টেম্বর পৌর শহরের প্রধান সড়কটি নিয়ে লিখেছেন, কার্পেটিং করা প্রয়োজন।
গুণী এ সাংবাদিকের একটি ডায়রীতে এমন অসংখ্য তথ্য রয়েছে। তিনি রেকর্ড সংরক্ষণ করতেন। তাই লিখতে পারতেন, পুরো বছর, মাসের ঘটনাও। তাইতো তিনি পুরো এপ্রিল মাসের সংবাদ নিয়ে ২০০০সালের ৫ মে প্রকাশ করেন ‘শুধুমাত্র ১মাসের খতিয়ান’। ময়মনসিংহের ৮উপজেলায় ১১খুন, এ ধরনের সংবাদ শিরোনাম বলে দেয়, তিনি সংবাদ ও সাংবাদিকতায় কতোটুকু সক্রিয় ছিলেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন ক্রীড়া সংগঠক। ছিলেন উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদকও। সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব জার্নালিস্টের সদস্য ছিলেন তিনি। সাংবাদিকতা বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ পাশ করে দৈনিক সংবাদে যোগদান করেন। স্থানীয় জাতীয় সংবাদপত্র দৈনিক জাহানের সাব-এডিটর হিসাবেও কাজ করেন। গৌরীপুর সমাচার নামে তিনি একটি সংবাদপত্রের সম্পাদক, আদর্শ পরিবার সংস্থা পরিচালিত পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রকল্পের নির্বাহী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সংবাদপত্র জগতে সাংবাদিক সুরেশ কৈরী ছিলেন গৌরীপুরের সাংবাদিকদের অগ্রপথিক।
২০০০সালের ১৩ মে এই দিনে চিরবিদায় নেন। তিনি মৃত্যুকালে স্ত্রী আলো কৈরী ও ২মেয়ে রেখে যান। সাংবাদিকতায় অবদান রাখায় গৌরীপুর পৌরসভা থেকে সাংবাদিক সুরেশ কৈরীকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করেন। গৌরীপুর পৌরসভা তাঁর সম্মানে শহরের একটি রাস্তার নামকরণ করেন। গুণী এ সাংবাদিকের আত্মার স্বর্গীয় সুখ কামনা করছি।


মো. রইছ উদ্দিন
উপজেলা প্রতিনিধি, দৈনিক যুগান্তর, গৌরীপুর,
প্রধান প্রতিবেদক, দৈনিক স্বজন, গৌরীপুর অঞ্চল।
১২/০৫/২০১৮
০১৭১৮০৬৯২১০

Print Friendly, PDF & Email