Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

| |

ব্রেকিং নিউজঃ

ইন্টারনেটে শিশু-কিশোর

আপডেটঃ 5:53 pm | August 20, 2018

বাহাদুর ডেস্ক:

একটা সময় ছিল যখন শিশু-কিশোরদের দেখা যেত মাঠে খেলা করতে। বিকেল, সকাল ও দুপুর। যখন খেলতে যেত কিশোররা, তাদের কলকাকলীতে মাঠগুলোকে ফুরফুরে সতেজ মনে হতো। ফুটবল, কাবাডি, কানামছি, দাঁড়িয়াবান্ধা খেলার একটা স্বাভাবিক এবং বাধ্য দৃশ্য যেন ছিল এই বাংলার। কিন্তু হঠাৎ একদিন প্রকৃতিতে গ্রহণ লাগে। কেন যেন কুনজর লেগে বসে আমাদের কিশোরদের খেলাতে। আমরা হারাই কিশোরদের সেই মাঠ থেকে। মাঠও হারায় কিশোরদের। একটা হাহাকার যেন! কিশোরদের কচি পা-এর অভাবে সেই মাঠগুলোয় ইটের ভবন গড়ে ওঠে। কিশোররা আটকে যায় সেই ইটের বন্দি ঘরে। ওদের ভেতর গুমরে ওঠা কান্নাগুলো এক এক করে যখন বড্ড একাকিত্ব দানাবাঁধে, ছোট্ট কচিপ্রাণে তখন আসে এক মামদো ভূত কম্পিউটার। ওদের সব মনোযোগ, খেলাধুলার ইচ্ছাকে আঁকড়ে নেয় এই যন্ত্রের ভুবনে। ধীরে ধীরে মোবাইল, ল্যাপটপ, ট্যাব নামক যন্ত্রগুলা ওদের বেশি আলোড়িত করে ফেলে।

শিশু-কিশোররা বেশি অনুকরণপ্রিয় হয়, ওরা চায় নিজেদের প্রকাশ করতে, নতুন নতুন চাওয়া জিজ্ঞাসা ওদের মননজুড়ে। ওরা নিত্য জানার খোঁজে সর্বত্র চষে বেড়ায়। নয়া সব মোবাইলের কেরামতি স্মার্টফোন, আইফোন ওদের আগ্রহকে দ্বিগুণ করে নেয়। একটা সময়ে ফাইনালি বড়দের ব্যবহৃত জিনিসগুলো চলে আসে শিশু-কিশোরদের হাতে। ওরা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে ইন্টারনেট সময়ের সেরা অ্যাপসগুলোয়। অনলাইন, অপলাইনে ওরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কোনো স্কুলপড়–য়া ছেলেমেয়ে এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না যারা জানে না নেট, গুগল, সফটওয়্যার সম্পর্কিত বিষয়গুলো।

শহরের, গ্রামের কিশোর বয়সীরা মোবাইল, কম্পিউটার ইত্যাদি বিষয়ে জানা এক-একটা সময়ের যেন তারকা এক্সপার্ট। আশ্চর্য হলেও সত্য, ড্রইং, কবিতা, আবৃত্তি, গান, নাচ, অভিনয় শিখতে কোনো প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। কিন্তু কম্পিউটারের অফিস প্রোগ্রামটি একবার কিশোরদের হাতে পড়লেই বাকিগুলো আর শিখতে বেগ পেতে হয় না, শিক্ষকের প্রয়োজন হয় না। বরং অনেকেই এগুলো এমনিতে দূর থেকে দেখেও শিখে নিতে পারে। আমার জানা মতে, কয়েকজন শিশু-কিশোরকে দেখেছি বাবা-ভাই, মামা, চাচাদের হাতে মোবাইল একটু পাশ থেকে টেপাটেপি দেখে সে বুঝতে পারে কী করছে। মোবাইল পাসওয়ার্ডটি কীভাবে দিয়েছে; দূর থেকে দেখে বুঝে যায়। বুঝে কীভাবে বিভিন্ন অপশনে ঢোকা যায়। একবার কোনোভাবে লুকিয়ে হোক বা কান্নাকাটি করে হোক সে মোবাইল ফোনটি হস্তগত করতে পারলে আর যায় কোথায়। এক বছর পার হলেই একটা শিশু এখন মোবাইল কী জিনিস বুঝতে পারে। তিন থেকে পাঁচ বছরের বাচ্চা ডাউনলোড করে খেলা করে সারাক্ষণ মোবাইলে। বড়রা অবাক হতো একসময়। অবশ্য এখন অবাকটা আর কারো মধ্যে নেই। এটা স্বাভাবিক এখন সবার কাছে। যতই বড় হয় সময়ের স্রোতে তাদের এসবের প্রতি আগ্রহের মাত্রাও বাড়তে থাকে।

কিশোররা আজ যে স্মার্টফোনে বেশি আসক্ত, সে আসক্ততা ওদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে কেড়ে নিয়েছে। করে ফেলেছে ওদের পঙ্গু। এটা এক ধরনের চোখ দিয়ে ডিজিটাল মাদক গ্রহণের মতো। ইন্টারনেট চোখের জন্যই এক ক্ষতিকারক রোগ। অনেক ছেলেমেয়ে এখন চোখের সমস্যায় ভোগে। স্কুলপড়–য়া প্রায় সবার চোখেই চশমা। মাদকের মতো এ এক নেশা যেন, যা প্রতিদিনের ঘুম ছাড়া প্রায় চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আঠারো ঘণ্টাই থাকে ওরা ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইডে, মোবাইল হাতে। পাঁচ-ছয় বছরের বাচ্চা খেলনা দিয়ে ওরা ওদের জন্য নির্ধারিত খেলা খেলতে চায় না। ওসব কবেই ভুলে গেছে! লুডু পর্যন্ত এখন মোবাইলে খেলা যাচ্ছে। কার্টুনের সঙ্গে কথা বলছে, গেম খেলছে। কমিউনিটি গ্রুপ করে চ্যাট করাও শিখছে বিদেশি ছেলেমেয়েদের সঙ্গে। মশগুল ফেসবুক ও টুইটারে। একদমই পড়ালেখা করতে চায় না তারা। গল্পের বই পড়তে চায় না। ঘরে, ঘরে একটা যুদ্ধ, অশান্তি। কিশোর আচার-আচরণে চলে এসেছে বিধ্বংসিতা। পাড়ার ছেলেদের হাতে, ক্লাসে সহপাঠীর কাছে দামি মোবাইল দেখেছে, তারও একটা দামি মোবাইল চাই।

মোবাইল পর্বটি কিনে চাওয়ার সাধ পূরণের আখের ঘুচিয়ে অত্যন্ত বিরক্ত কিশোর ছেলেটির বাবা যখন একটু নিঃশ্বাস নিচ্ছেন, তখন শুরু হয় নতুন আরেক যন্ত্রণা। কিশোর ছেলেটির বাবারা ছোটে দ্বারে দ্বারে সন্তানকে বাঁচাতে। সন্তানকে কোনো একদিন পাড়ার এলাকার কিছু বখাটে ধরে নিয়ে গেছে বিভিন্ন মিথ্যা কথায় ফেলে। কোনো দিন হয়তো তাদের কথা শোনেনি, তাদের টাকা দেয়নি, তার হাত থেকে মোবাইল ফোনটি তাই কেড়ে নেয়। অনেক কষ্ট করে বাবারা সন্তানকে বখাটেদের হাত থেকে রক্ষা করে।

আবার দেখা যায় অসৎ বন্ধুর পাল্লায় পড়ে কিশোর ছেলেরা মাদকে নিমজ্জিত। স্কুলের ছাত্র মাদকের নেশায় কাটে তার দিন। মা-বাবা বুঝতে পারেন সন্তানের ভেতর পরিবর্তন। চলাফেরা, আচরণে অদ্ভুত পরিবর্তনের লক্ষণ! রাত জাগা, মিথ্যা বলা, স্কুল-কলেজ না যাওয়া, প্রাইভেটের নামে অন্যত্র যাওয়া, টাকা চাওয়া বিভিন্ন অজুহাতে। এমনকি শখের মোবাইলটি তার হাতেও দেখা যায় না একসময়। নেশার খরচ মেটাতে মোবাইল বিক্রি, ঘর থেকে বাবার টাকা চুরি, ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র হাওয়া ইত্যাদি কার্যাদি কিশোর ছেলেটির মধ্যে ধীরে ধীরে অনুপ্রবেশ করে। ফেনীতে বিভিন্ন স্কুল-কলেজপড়–য়া ছেলেকে ইতোমধ্যে মোবাইল কোর্ট ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধরে এনেছে। এদের পেছনের গডফাদার আর কথিত বড় ভাইরা ওদের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। কিশোরদের শাস্তি না দিয়ে বড়ভাইদের, বড় শক্তিকেও আইনের আওতায় আনা উচিত। কেননা এটাতে সমাধান নেই। বরং বাড়ে। একটা অপরাধীর বন্দিত্ব আরেকটা অপরাধী গড়তে সহযোগিতা করে। যারা মূলহোতা তারা থেকে যায় বাইরে।

কিশোর ছেলেদের একটা গ্যাং তৈরি হয়েছে এখন প্রতি শহরে। ম্যাসেঞ্জারে ওদের দৈনন্দিন কথা চলে প্রতি মিনিটে। গ্যাংরা যত দূরেই থাকুক। ইন্টারনেট এখন সব দূরত্ব ওদের থেকে কেড়ে নিয়েছে। তাই অপরাধীরা সব প্রান্তে বসেই তাদের কাজগুলো করছে অনায়াসে নেটের কারণে। ওদের হাতে বিশ্বের বাজে খবরাখবরগুলো বিশেষ করে পশ্চিমা সংস্কৃতি, নোংরা ভিডিও থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা ওদের মন মগজে এমনভাবে গেঁথে গেছে, ওসবই তাদের ধ্যান, জ্ঞান নেশা। তাদের এগুলো জানা যেন একটা ফ্যাশন। এভাবে জঙ্গিবাদেও জড়াচ্ছে কিশোররা।

এক জরিপে দেখা যায়, রাজধানীর ঢাকায় প্রায় ৭৭ ভাগ কিশোর পর্ণোগ্রাফি দেখে। এরপর জেলা, উপজেলায় এর বিস্তার ঘটেছে দ্বিগুণভাবে। রাজধানীর মতো বারবিকিউ পার্টির নামে জেলা শহরের ছেলেরাও জড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট, কোন বড়লোক বাবার সন্তান, যার প্রতি বাবা-মায়ের নেই কোনো সচেতনতা, তাদের বাসার ছাদে সব ছেলেকে এনে রাতভর পার্টির নামে মাদক নেওয়া, বিভিন্ন ড্রাগস গ্রহণ করা। নেশাগ্রস্ত হয়ে সারা দিন ঘুমিয়ে কাটানো। পড়ালেখা থেকে একেবারে দূরে সরে যাওয়া। অনেক পরিবারই আছে যারা ইন্টারনেট সম্পর্কে জ্ঞান কম। তাদের ছেলেরা একসময় এসব ব্যবহারে নষ্ট হয়ে পড়ে। মোবাইলে তারা যে গেমসগুলো দেখে তা বেশির ভাগই যুদ্ধ, মারামারি, হিংস্রতার। ওরা হারা শেখে না। গেমসে তারা কেবল বিজয়ী হতে শেখে। তার প্রভাব পড়ে সামাজিক জীবনে। এসব পরিবার যত দিন না শুধবে, তাদের ছেলেদের কন্ট্রোল না করবে, তত দিন সমাজ থেকে এই ভয়াবহ সমস্যাটা দূর হবে না। কেননা একটি ভালো পরিবার শত চেষ্টা করেও তার সন্তানকে অসৎ বন্ধুর খপ্পরে পড়া বড় ভাই বা সহপাঠী থেকে রক্ষা করতে পারে না। কেননা সন্তানকে ফেরালেও সেই অসৎ বন্ধু তার পিছু ছাড়ে না। তাদের কুমন্ত্রণা একটা পরিবারকে চিরতরে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। স্কুলপথে আটকাবে, কোনোভাবে ফুসলিয়ে বা ভয়ভীতি এমনকি অস্ত্রের মুখে তাদের কাছে আবার যেতে তাদের বাধ্য করে। আর মাদকের ভয়াবহ নেশা তো একবার প্রয়োগ ঘটালে দেহে বারবার তা গ্রহণেও কিশোররা ছুটে তাদের কাছে। বড় অসহায় আমাদের কিশোরগুলো আজ। ওদের দেখলে কষ্ট হয়। ওদের ভবিষ্যৎ কতভাবে যে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তাদের অবুঝ মন, তার খোঁজ হয়তো কখনো পাবে বা তারা পাবে না কখনো; কী হারাচ্ছে। বাবা-মায়ের আদর, ভালোবাসা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। এবার ২০১৮ সালের এসএসসি ও এইচএসসির রেজাল্ট আগের তুলনায় অনেক খারাপ। এর কারণ ইন্টারনেটে ডুবে থাকার ফল। ইন্টারনেট, অনলাইন থেকে মুক্ত করতে শিশু-কিশোরদের প্রয়োজন নিরাময় কেন্দ্র, যা পূর্ব এশিয়ায় বিশেষ করে চীনে নিরাময় কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এই দেশেও প্রয়োজন এমন নিরাময় কেন্দ্র। সময় থাকতে বাঁচানো উচিত আমাদের কিশোর ভবিষ্যৎ। আমাদের ভবিষ্যতের এক-একটা প্রদীপ এই শিশু-কিশোররা। যাদের হাতে থাকবে বাংলাদেশের গুরুদায়িত্বের মশাল।

Print Friendly, PDF & Email