Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

| |

লক্ষ্য এবার শিরোপা

আপডেটঃ 6:11 pm | September 27, 2018

বাহাদুর ডেস্ক:

ওই ক্ষিপ্রতাটা কেবল বাঘেরই থাকে, সেকেন্ডের ৮৭ ভগ্নাংশেরও কম সময়ে তাই ২ দশমিক ৩৫ মিটার দূরত্বের ক্যাচ ধরতে পারেন মাশরাফি। ফেটে যাওয়া দুই আঙুলে ব্যান্ডেজ বেঁধে আবার নামতে পারেন মাঠে। ওই ক্ষিধেটাও শুধু বাঘেরই থাকে। তাই আহত পাঁজর জার্সির নিচে টেপ দিয়ে বেঁধে ৯৯ রান করতে পারেন মুশফিক এতটুকু যন্ত্রণা প্রকাশ না করে। ওই জিদটাও বাঘের মধ্যেই থাকে, তাই তো কোনোরকম উচ্ছ্বাস না দেখিয়েও মুস্তাফিজ আঁচড় কাটতে পারেন পাকিস্তানের টপঅর্ডারে। আবুধাবিতে দেখা এই বাঘের দলকে কার সাধ্যি আছে ঠেকিয়ে রাখার। কার ক্ষমতা আছে মরুর বুকে বাঙালির এই বিজয় রুখে দেওয়ার। শোয়েব মালিক, ইমাম-উল-হকরা পারেননি, তাদের হোম ভেন্যুতেই ৩৭ রানে হারিয়ে দিয়েছে টাইগাররা। বুঝিয়ে দিয়েছে মিরপুরে যে জয়গাঁথা শুরু হয়েছিল বছর তিনেক আগে, সেটা চলমানই থাকবে। কাল দুবাইয়ে ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল খেলবে বাংলাদেশই; অন্য কেউ নয়। আর লক্ষ্য এবার একটাই- এশিয়া জয়ের শিরোপা।

পাকিস্তানের বিপক্ষে গত রাতের অনবদ্য সাফল্যে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ঘটনাবহুল ম্যাচে তামিম নেই, সাকিবও দেশে ফিরে গেছেন; চোট-আঘাতে জর্জরিত দলের ড্রেসিংরুম যেখানে মেডিকেল রুম হয়ে গেছে। সেই দল তখনই এমনটা খেলতে পারে, যখন ‘টিম স্পিরিট’ একেবারে তুঙ্গে থাকে। প্রচণ্ড মনের জোর দিয়ে শরীরের অস্বস্তিটাকে জয় করতে পারে। ঠিক সেটাই ধরা পড়েছে কাল মাশরাফিদের খেলার মধ্যে। অথচ ইউএস-বাংলার ফ্লাইটের মতোই ‘নোজ গিয়ার’ যেন আটকে গিয়েছিল ইনিংসের শুরুটা! সামনের তিন ব্যাটসম্যান ১২ রানের মধ্যে ‘নাই’ হয়ে যাওয়ায় ষোলো কোটি বাঙালির আশাসমতে উড়তে থাকা গোটা ইনিংসটিই যেন মাঝ আকাশে মৃত্যুমুখের সম্মুখীন হয়। বাঁচানোর দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে এর পরই যেন ককপিটে চড়ে বসেন ‘পাইলট মুশফিক’ আর ‘কো-পাইলট মিঠুন’! শেষ পর্যন্ত তাদের দক্ষতাতেই রুক্ষ মরুর মধ্যে শেখ জায়েদ স্টেডিয়ামে সামনের চাকা ছাড়াই নিরাপদে অবতরণ করে বাংলাদেশের ইনিংসটি। মিঠুনের সঙ্গে মুশফিকের ১৪৪ রানের জুটিতেই ফিরে আসে টাইগারদের রুদ্রমূর্তিটা। অতীত বলছে, এশিয়া কাপে মুশফিকই প্রথম ব্যাটসম্যান, যিনি কি-না ৯৯ রানে আউট হলেন! এর আগে ওয়ানডেতে দুবার নব্বইয়ের ঘরে আউট হয়েছিলেন তিনি। এবারের এশিয়া কাপে শিখর ধাওয়ানের ৩২৭ রানের পর মুশফিকই তালিকার দ্বিতীয়তে আছেন চার ম্যাচে ২৯৭ রান নিয়ে। ওয়ানডেতে নিজের সপ্তম সেঞ্চুরিটি মিস করলেন মুশফিক এমন সময়ে, যখন তাকে আর কিছু ওভারের জন্য দরকার ছিল। তার চলে যাওয়ার পর ৫০ বল থেকে আসে মাত্র ৪২ রান; প্রত্যাশার চেয়ে যা অনেকটাই কম ছিল।

সৌম্য ও মুমিনুল দু’জনের জন্যই দারুণ সুযোগ ছিল এদিন নিজেদের প্রমাণ করার। এগারো মাস পর খেলতে নামা সৌম্য চারটি বল ‘ডট’ খেলার পরই রানের জন্য অস্থির হয়ে গিয়ে জুনায়েদের বুকসমান শট বল পুল করতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে বসেন। মুমিনুল অবশ্য দারুণ এক ফ্লিকে বাউন্ডারি হাঁকানোর পরের বলেই শাহিন আফ্রিদির গতি আর স্কিডের কাছে পরাস্ত হয়ে বোল্ড হয়ে যান। এরপর মুশফিক-মিঠুন কীভাবে ইনিংসটি মেরামত করেছেন, তার একটা সূক্ষ্ণ কৌশল লক্ষ্য করা যেতে পারে। তিন উইকেট পড়ে যাওয়ার পর মুশফিক আর মিঠুন মিলে পরের ২১ বল থেকে মাত্র ৩ রান আদায় করেন। পাকিস্তানি বোলাররা গরমে কিছুটা ক্লান্ত হওয়ার পর শুরু হয় বাউন্ডারির রাস্তা মাপা। জুনায়েদ ও আফ্রিদিকে কভার আর পয়েন্ট দিয়ে বাউন্ডারি হাঁকান মুশফিক। দু-তিন ওভারে কুড়ির মতো রান আসার পর আবার এক, দুই করে ইনিংস এগিয়ে নেওয়া। ইনিংসের ১৫.৫ থেকে ২৬.১ (৬২ বল) কোনো বাউন্ডারি আসেনি। অথচ রান এসেছিল ৫৩টি! ওই গরমে এক, দুই করে রান নিতে গিয়ে মুশফিকের খুব কষ্ট হচ্ছিল। এমনিতেই পাঁজরে চোট থাকায় ম্যাচের সময় গায়ে একাধিক টেপ জড়িয়ে খেলতে নামেন; তার জন্য ওই সময় দৌড়ে অতগুলো রান নেওয়াটা ছিল শরীরের বিরুদ্ধে গিয়ে মনের জোরে এগিয়ে যাওয়া। মুশফিক সেটাই করেছেন। দলের স্কোর একশ’ পেরোনোর পর তিনি স্লগ সুইপ খেলেছেন, রিভার্স সুইপ খেলেছেন। কোনো ধরনের ঝুঁকি ছিল না তার ব্যাটিংয়ে। সেইসঙ্গে মিঠুনকে সাহস জুগিয়ে ছিলেন তিনি। মিঠুনও হাসান আলিকে পুল খেলে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, চাপের মুখে ভেঙে পড়ার লোক নন তিনি। যদিও জুনায়েদের বুকসমান বল চালাতে গিয়ে টাইমিংয়ের ভুলে ক্যাচ দিয়ে বসেন মিঠুন। তবে তার ৮৪ বলে করে যাওয়া ৬০ রানের ইনিংসটি সত্যিই জীবনদায়ী ছিল। ৮৪ বলের মধ্যে মাত্র চারটি বল বাউন্ডারি হাঁকিয়েছেন তিনি। বাকি রানগুলো তাকে ওই গরমে দৌড়িয়েই নিতে হয়েছে। আর এটাই হলো আবুধাবিতে সফল হওয়ার একমাত্র রাস্তা।

এই আবুধাবিকে ‘হোম ভেন্যু বানিয়েও এত দিনে শিখতে পারেনি পাকিস্তান’- পেছন থেকে পাকিস্তানি সাংবাদিকদের আড্ডা থেকে কানে আসছিল কথাগুলো। প্রথম ওভারেই মিরাজকে এগিয়ে মিডঅনে ক্যাচ দিয়েছিলেন ফখর জামান। মাথার ওপর দিয়ে যাওয়া দুর্দান্ত ক্যাচ ধরেছিলেন রুবেল। পরের ওভারেই মুস্তাফিজের গতির কাছে পরাস্ত হয়ে এলবিডব্লিউ হয়ে যান বাবর আজম। এরপর পাকিস্তান অধিনায়ক সরফরাজও মুস্তাফিজের অফস্টাম্পের বাইরের বল জায়গায় দাঁড়িয়ে খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন উইকেটের পেছনে। একদিকে ঝাঁপিয়ে অসাধারণ ক্যাচটি ধরেছিলেন মুশফিক। তবে চোট পেয়েছিলেন তিনি তখনই। এরপর পনেরো ওভারের মাথায় লিটনকে গ্লাভস দিয়ে চলে যান ড্রেসিংরুমে। যদিও মুশফিকের ভরসা গ্লাভসের মর্যাদা রাখতে পারেননি লিটন। আসিফ আলি ২২ রানে থাকতে মুস্তাফিজের বলে অতি সাধারণ একটি ক্যাচ এক হাতে তুলতে গিয়ে ফেলে দেন লিটন। অথচ তার কিছুক্ষণ আগেই শোয়েব মালিকের একটি ক্যাচ কী ক্ষিপ্রতার সঙ্গেই না ধরেছিলেন মাশরাফি। তার ওই ক্যাচের পরই মালিক আর ইমামের ৬৭ রানের জুটি ভেঙেছিল। তবে লিটনের ওই ক্যাচের খেসারত দিতে হয়েছিল অনেকক্ষণ পর্যন্ত। যে উইকেটটি পড়তে পারত ১২৮ রানে, সেটি পড়েছিল শেষ ১৬৫ রানে। এবার অবশ্য মিরাজের বলে স্টাম্পিংটা ভালোই করেছিলেন লিটন। টেনশন যা একটু ছিল, তা ওই পাকিস্তানি ওপেনার ইমাম-উল-হককে নিয়েই। তাকেও এরপর স্টাম্পিং করেন লিটন। ইমামকে এগিয়ে আসতে দেখে জোরের ওপর বলটি ছেড়েছিলেন রিয়াদ, বল গ্লাভসে পেয়ে আর সময় নেননি লিটন।

১৬৭ রানে পাকিস্তানের ৭ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর মাঠের ডিজে আর ‘জিতেগা ভাই জিতেগা… পাকিস্তান জিতেগা…’ স্লোগান তোলার সাহস দেখাননি। ২০২ রানে পাকিস্তানিদের দৌড় ফুরিয়ে যাওয়ার পর রাতের গ্যালারিতে তখন শুধুই প্রবাসীদের আকুল চিৎকার- বাংলাদেশ, বাংলাদেশ। ঘোর লেগে যায় সেই ধ্বনিতে।

Print Friendly, PDF & Email